Showing posts with label সায়েন্স ওয়ার্ল্ড. Show all posts
Showing posts with label সায়েন্স ওয়ার্ল্ড. Show all posts

Monday, December 2, 2019

বিজ্ঞানের সেরা দশ রহস্য


বিজ্ঞানের অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে কথা উঠলে অনেককে হয়তো বলতে শুনবেন বিবর্তনবাদের সত্যতা, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের অস্তিত্বের কথা, অথবা ভ্যাকসিন আসলেই নিরাপদ কিনা। কিন্তু এগুলো নিয়ে আসলে বিজ্ঞানে কোনো বিতর্ক নেই। বিবর্তনবাদ আসলেই প্রমাণিত সত্য, জলবায়ু পরিবর্তনও ঘটছে খুব দ্রুত, এবং ভ্যাকসিন আসলেই শিশুদের জন্য নিরাপদ। এগুলোর একদম নগণ্য কিছু ব্যাপার নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু মূল বিষয়গুলো নিয়ে নয়। তাই বলে বিজ্ঞানীরা কিন্তু এই মহাবিশ্বের ব্যাপারে সব জেনে বসে নেই।

পদার্থবিদ ব্রায়ান কক্স বলেছিলেন, “অজানা বিষয় আমাকে নার্ভাস করে না – বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য তো এটাই। এমন বিলিয়ন বিলিয়ন জায়গা আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। আর এই না জানাটা আমাকে আগ্রহী করে তোলে, সেগুলোর ব্যাপারে জানার জন্য। এবং এটাই বিজ্ঞান। অজানার ব্যাপারে ভাবতে গিয়ে আপনি যদি সহজ হতে না পারেন, তাহলে বিজ্ঞানী হওয়াটা আপনার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। আমি কেবল একটা উত্তর চাই না। আমি সবকিছুর উত্তর চাই না। আমি চাই – এমন কিছু ব্যাপার থাকুক, যেটার উত্তর খুঁজতে হবে।”

তো, বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলো কী? এই নিন, আমাদের সেরা দশ!

(১)


পার্টিক্যাল ফিজিক্স নিয়ে আমাদের সাম্প্রতিক ধারণা বলে যে, ম্যাটার এবং এন্টিম্যাটার (বস্তু ও প্রতিবস্তু) আসলে সমান ও বিপরীতমুখী। যখন এদের মোলাকাত ঘটে, তখন এরা একজন আরেকজনকে ধ্বংস করে দেয়, কিছুই বাকি রাখেনা। এবং এ ধরনের অধিকাংশ ধ্বংসযজ্ঞ ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির প্রথম দিকে হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও এতো এতো বস্তু রয়ে গেছে যেগুলো দিয়ে আমাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ছায়াপথ, নক্ষত্র, গ্রহ, এবং অন্যান্য সবকিছু তৈরি হয়েছে। তাহলে, এন্টিম্যাটার কই?

Slide2

কিছু কিছু ব্যাখ্যা আছে মেসনকে কেন্দ্র করে। মেসন হচ্ছে ক্ষণজীবী সাব-এটমিক পার্টিক্যাল, যা একটা কোয়ার্ক এবং একটা এন্টি-কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি। বি-মেসন কণাগুলো এন্টি-বি-মেসনের চেয়ে একটু ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এর ফলাফল অনুসারে, যথেষ্ট পরিমাণ বি-মেসন কণা টিকে গেছে, আর তা দিয়েই ব্রহ্মাণ্ডের সকল বস্তু তৈরি হয়েছে। তাছাড়া, বি, ডি, এবং কে-মেসন কণা নিজেদের স্পিন পরিবর্তন করতে পারে – একবার এন্টি-পার্টিক্যাল, আবার পার্টিক্যাল হতে পারে। রিসার্চে দেখা গেছে, মেসন কণা সাধারণত নরম্যাল অবস্থা (পার্টিক্যাল/বস্তুর রুপ) ধারণ করে, আর এজন্যেই সাধারণ বস্তুর পরিমাণ প্রতিবস্তুর চেয়ে বেশি।

(২)


ব্রহ্মাণ্ডের শুরুর দিকে, তাপমাত্রা ছিলো অনেক বেশি। তখন হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, আর লিথিয়ামের আইসোটোপ বেশ ব্যাপক হারে সংশ্লেষিত (synthesized) হয়েছে। হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। বলতে গেলে, ব্রহ্মাণ্ডের পুরো ভরটুকু এগুলো দিয়েই তৈরি। কিন্তু লিথিয়াম-৭ আইসোটোপ যতটুকু দেখা যাওয়ার কথা, তার মাত্র ৩৩% আমরা দেখতে পাই।

Slide3

কেন এমনটা ঘটলো, সেটার পেছনে বেশ কিছু ধরনের ব্যাখ্যা শোনা যায়। একটা হাইপোথিসিস হচ্ছে, অ্যাক্সিয়ন নামে একটা হাইপোথেটিক্যাল বোসন কণার উপস্থিতি। অন্যরা মনে করেন, লিথিয়াম আটকে গেছে নক্ষত্রগুলোর একদম গভীরে, কেন্দ্রের কাছাকাছি। আর এটা তো আমাদের বর্তমান টেলিস্কোপ বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে সনাক্ত করা যাবে না। যাই হোক, একেবারে শক্তপোক্ত কোনো ব্যাখ্যাই এই দৌড়ে পরিষ্কারভাবে এগিয়ে নেই।

(৩)


আমরা এতোটুকু জানি যে, মানবদেহ একটা চক্রাকার ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে চলে, আর সেটাই মানুষকে ঘুম আর জেগে থাকার চক্র মেনে চলতে সহায়তা করে। এর পেছনের কারণটা কিন্তু আমরা জানিনা। ঘুমের সময়টাতে আমাদের দেহ টিস্যু মেরামত করে, অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজ করে। বলতে গেলে, আমরা আমাদের জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ নাক ডেকেই কাটাই। আবার, কোনো কোনো প্রাণী তো একেবারেই ঘুমায় না। আমরা কেন ঘুমাই?

Slide4

বেশ কিছু ধারণা প্রচলিত আছে এ ব্যাপারে, কিন্তু কেউই একদম পাকা কোনো উত্তর দিতে পারেনি। কেউ কেউ বলেন, বিবর্তনের সুবাদে যেসব প্রাণী শিকারীদের হাত থেকে লুকানোর সামর্থ্য অর্জন করেছে, তারা ঘুমানোর সুযোগ বের করে নিতে পেরেছে। কিন্তু যাদেরকে সবসময়েই সতর্ক থাকতে হয়, তারা ঘুম ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে বিশ্রাম নেয়ার বা নতুন উদ্যম অর্জন করার সামর্থ্য পেয়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা যদিও জানেন না আমরা কেন ঘুমাই, কিন্তু তারা বুঝতে পারছেন, ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব আসলে কতখানি (যেমন, মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা ঠিক রাখা)…

(৪)


সবাই জানি যে, চাঁদের আকর্ষণের ফলে জোয়ার-ভাটা হয়, পৃথিবীর অভিকর্ষের ফলে আমরা মাটিতে আটকে থাকি, বা সূর্যের মহাকর্ষেই গ্রহগুলো নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। কিন্তু, আসলে আমরা কতটুকু বুঝি মহাকর্ষের?

Slide5

বস্তু থেকে এ ধরনের শক্তিশালী একটা বল তৈরি হয়, এবং দানবীয় বস্তুগুলোর অন্যান্য বস্তুকে আকর্ষণ করার ক্ষমতাও বেশি। বিজ্ঞানীরা ভালোই বোঝেন, মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করে। কিন্তু জানা নেই, কেন এই বল অস্তিত্বশীল। কেন পরমাণু জিনিসটা বলতে গেলে পুরোটাই ফাঁপা? পরমাণুকে যে বল ধরে রাখে, কেন সেটা মহাকর্ষের চেয়ে ভিন্ন। মহাকর্ষ কি আসলে কোনো বস্তু? পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আমাদের বর্তমান যে ধারণাগুলো আছে, সেগুলো দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া যায় না এখনো।

অনুবাদক নোট – মহাকর্ষ কিভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে গেছি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আবিষ্কারের পর।

(৫)


দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাস ৯২/৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। অর্থাৎ, এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত যেতে, আলোর লেগে যাবে ৯২/৯৩ বিলিয়ন বছর। বিশাল এই মহাবিশ্ব ছায়াপথ, নক্ষত্র, আর গ্রহ দিয়ে ঠাসা। কিন্তু এখন পর্যন্ত পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও প্রাণের যথোপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে, পুরো মহাবিশ্বে আমরাই একমাত্র প্রাণসমৃদ্ধ গ্রহের বাসিন্দা, এমনটা হবার সম্ভাবনা প্রায় একেবারেই অসম্ভব। তাহলে, এখন পর্যন্ত কারো সাথে যোগাযোগ তৈরি হলো না কেন?

Slide6

এটাকে বলে ফার্মি’র ধাঁধাঁ (Fermi Paradox). এবং কেন মহাজাগতিক প্রাণীর দেখা পেলাম না – এটার ব্যাখ্যা আছে বেশ কয়েক ডজন, প্রত্যেকটা শুনতে আগেরটার চেয়ে চমৎকার। ঐ সম্ভাবনাগুলো নিয়ে আমরা দিনের পর দিন আলোচনা করে যেতে পারি – আমরা কি কোনো সিগন্যাল মিস করলাম, তারা কি এসে আমাদের অজান্তেই চলে গেলো, ওরা কি আমাদের সাথে কথা বলতে পারেনি অথবা ওদের ইচ্ছাই হয়নি, নাকি সবচেয়ে অদ্ভুত এবং প্রায় অসম্ভব (পৃথিবীই একমাত্র প্রাণময় গ্রহের) ব্যাখ্যাটাই সত্য?

(৬)


মহাবিশ্বের সমগ্র ভরের প্রায় ৮০ ভাগই ডার্ক ম্যাটার দিয়ে তৈরি। ডার্ক ম্যাটার জিনিসটা বড় অদ্ভুত, এরা তো কোনো আলো প্রতিফলিত করেনা। যদিও ৬০ বছর আগে এদের অস্তিত্বের তত্ত্ব হাজির করা হয়েছিলো, তবু এখন পর্যন্ত এদের অস্তিত্বের কোনো যথাযথ প্রমাণ নেই।

Slide7

অনেক বিজ্ঞানী ধারণা পোষণ করেন যে, ডার্ক ম্যাটার আসলে দুর্বলভাবে মিথষ্ক্রিয়ারত দানবীয় বস্তু, যাকে ইংরেজিতে বলে WIMP (Weakly Interacting Massive Particle). জিনিসটা প্রোটনের চেয়ে ১০০ গুণ দানবীয় হতে পারে। কিন্তু, baryonic matter এর সাথে এরা স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো প্রতিক্রিয়া করে না। আর তাই, সনাক্ত করার জন্য আমরা যে যন্ত্রপাতিগুলো ব্যবহার করি, সেগুলোতে এদেরকে ধরা যায়না। ডার্ক ম্যাটারের উপাদান হবার দৌড়ে এগিয়ে আছে axions, neutralinos, and photinos.

(৭)


পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব কীভাবে হলো? কোত্থেকে এলো? যারা মনে করেন, আদিম/মৌলিক স্যুপ মডেলকে কারণ হিসেবে মনে করেন, তাদের ধারণা – আদিম পৃথিবী এতোটা পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ ছিলো যে, সেখান থেকে জটিল থেকে জটিলতর অণু তৈরি হয়েছে, যা অবশেষে প্রাণের উৎপত্তি ঘটিয়েছে। এটা গভীর সমুদ্রের তলদেশে, আগ্নেয়গিরির জালামুখে ঘটে থাকতে পারে, কাদাতেও হতে পারে, বরফের নিচেও হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন মডেলে, প্রাণের উৎপত্তির ক্ষেত্রে, বজ্রপাত বা আগ্নেয়গিরির কর্মকাণ্ডকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

Slide8

এখন পৃথিবীতে প্রাণের সর্বময় ভিত্তি হচ্ছে ডিএনএ (DNA). বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রথমদিকের প্রাণের ক্ষেত্রে আরএনএ (RNA)-ই প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি, অন্য কিছু বিজ্ঞানী DNA, RNA ছাড়া অন্যান্য নিউক্লিক এসিডের উপস্থিতির কথাও প্রস্তাব করেছেন। প্রাণ কি মাত্র একবারই তৈরি হয়েছে? নাকি তৈরি হয়ে, বিলুপ্ত হয়ে, আবার তৈরি হয়েছে? কেউ কেউ panspermia তে বিশ্বাস করেন, যে মত অনুসারে পৃথিবীতে প্রাণ নিয়ে এসেছে কোনো ধূমকেতু বা মহাজাগতিক প্রস্তরখণ্ড। এমনটা যদি ঘটে থাকে, তাহলে প্রশ্ন রয়েই যায়, ঐ প্রাণ কীভাবে তৈরি হলো?

(৮)


শুনতে আশ্চর্য লাগলেও, কনটিনেন্টাল প্লেটের নড়াচড়া, মহাদেশকে নতুন আকৃতি দেয়া, ভূমিকম্প ঘটানো, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, এমনকি পর্বতের উত্থান – এই থিওরিগুলো আসলে খুব সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়েছে। যদিও ১৫০০ সালের দিকেই প্রস্তাব এসেছিলো যে, মহাদেশগুলো একসময় একটাই ভূ-খণ্ড ছিলো (মানচিত্র দেখলে যে কেউই বুঝতে পারার কথা), তবু ১৯৬০ সালের আগে পর্যন্ত এই ধারণাটা পালে হাওয়া পায়নি। ঐ সময়টাতেই সাগরের মেঝের বিস্তৃতির সপক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, আর তখনই সাড়ে চারশো বছর পুরনো থিওরি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাগরের মেঝের বিস্তৃতির ধারণাটা হচ্ছে, ভূ-পৃষ্ঠ থেকে শিলাগুলো ম্যান্টল স্তরে পৌঁছে যায়, ওখানেই রিসাইকেল হয়, এবং আবার ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসে ম্যাগমা হয়ে।

Slide9

অবশ্য, বিজ্ঞানীরা জানেন না, কেন প্লেটগুলো স্থির নেই, অথবা ঠিক কীভাবে প্লেটগুলোর সীমানা নির্ধারিত হলো। আছে থিওরি বেশ কয়েকটাই, কিন্তু কোনোটাই সবগুলো ব্যাপারকে একসাথে ব্যাখ্যা করতে পারেনা।

(৯)


অনেক প্রাণী আর কীটপতঙ্গ এক স্থান থেকে বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে অন্য স্থানে বাসস্থান স্থাপন করে – প্রধানত, ঋতু ও তাপমাত্রার পরিবর্তন এড়ানোর জন্য, পানি বা খাদ্যের ঘাটতির জন্য, অথবা সংগীর খোঁজে। কিছু কিছু মাইগ্রেশন তো হাজার হাজার কিলোমিটার দূরত্বের হয়ে থাকে। তো, কীভাবে এরা বছরের পর বছর, বারবার যাওয়া-আসার সেই পথের সন্ধান পায়?

Slide10

একেক প্রাণী একেক ধরনের সিস্টেম ব্যবহার করে, যাতায়াতের দিক নির্ণয়ের (ন্যাভিগেশনের) জন্য। কেউ কেউ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করতে পারে, নিজেদের মস্তিষ্কের কম্পাস ব্যবহার করে। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না, কীভাবে এই বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হলো; অথবা কীভাবে প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই প্রাণীগুলো মৌসুমের পর মৌসুম ধরে ঠিকঠাক ধরে ফেলছে যে আসলেই কোথায় যেতে হবে।

(১০)


বিজ্ঞানের সকল রহস্যের মধ্যে “ডার্ক এনার্জি” হয়তো সবচেয়ে বেশি সাসপেন্সে ভরপুর। একদিকে, ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের সমগ্র ভরের ৮০% এর জন্য দায়ী। আর অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি একটা হাইপোথেটিক্যাল এনার্জি, যাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় মহাবিশ্বের সকল কিছুর ৭০% তৈরির জন্য।

Slide11

এটার পেছনে অনেক রহস্য এখনো খোলাসা না হলেও, মহাবিশ্বের প্রসারের পেছনে ডার্ক এনার্জির হাত আছে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রথম ও প্রধানটা হলো, ব্যাটা কী দিয়ে তৈরি? ডার্ক এনার্জির পরিমাণ কি অপরিবর্তনীয়? নাকি মহাবিশ্বের একেক জায়গায় একেক রকম? ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব কেন সাধারণ বস্তুর ঘনত্বের কাছাকাছি মনে হয়? ডার্ক এনার্জি কি আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? নাকি এই থিওরিকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে?

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/unsolved_mysteries_of_science/

Saturday, November 2, 2019

কেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ একজন বন্ড ভিলেন হবার জন্যে উপযুক্ত – শেষ পর্ব


আগের দুই পর্বে (পর্ব ১, পর্ব ২) আমরা জেনেছিলাম, রেনেসাঁ যুগের মাস্টার মাইন্ড লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কিছু প্রযুক্তিগত চিন্তা-ভাবনার কথা, যেগুলো দেখলে ‘এম আই সিক্স’ এর মত বাঘা কোনো ইন্টেলিজেন্স সংস্থারও প্যান্ট নষ্ট হয়ে যেতো। যদি ভিঞ্চির আমলে তাদের অস্তিত্ব থাকতো, তবে তারা চাইতো ভিঞ্চিকে তাদের দলে ভেড়াতে। কিন্তু যেহেতু ভিঞ্চি বাস্তবে তার এইসব ভয়াবহ আবিষ্কার পুরোপুরি গোপন রেখে গিয়েছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, তাই ধারণা করা যায়- তিনি এম আই সিক্সের সেই অফারও ফিরিয়ে দিতেন। তখন বাধ্য হয়ে এম আই সিক্স তাদের ‘টপ টেরর’ তালিকার এক নাম্বারে নাম ঘোষণা করতো ভিঞ্চির। ভিঞ্চির লাইফ তামা তামা করতে তারা সবার সামনে তাকে উপস্থাপন করতো “মানবতার জন্যে হুমকি” হিসেবে। আর এদিকে এজেন্ট ‘জিরো জিরো সেভেন’ কে গোপনে লেলিয়ে দিতো ভিঞ্চির এসব আবিষ্কারের ব্লু-প্রিন্ট চুরি করার জন্যে। (হলিউডের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের থেকে বন্ড মুভির এই আইডিয়াটা ধার নিতে পারেন। না, কোনো টাকাপয়সা লাগবে না। এজেন্ট জিরো জিরো সেভেনের বিপরীতে ভিঞ্চির মত একজন মাস্টার মাইন্ডকে ভিলেন হিসেবে পেয়েই আমরা খুশি!)

কথা হচ্ছে- ভিঞ্চিকে সবার সামনে স্কারম্যাঙ্গা, গোল্ডফিঙ্গার, কিংবা ব্লোফেল্ড এর মত কিংবদন্তীতুল্য বন্ড ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করতে এম আই সিক্সের বেশী বেগ পেতে হতো না। এর কারণ আমাদের এই মাস্টার মাইন্ডের রেখে যাওয়া কিছু আবিষ্কারের নকশা; যেগুলো ভিঞ্চির শান্তিকামী, সৌন্দর্যপিপাসু শিল্পী-সত্তার আড়ালে এক ভয়াবহ সাইকোপ্যাথের উপস্থিতিকেই নির্দেশ করে। যেমন-

৭। ঘোড়ায় টানা রথ (ম্যাড ম্যাক্স স্টাইল)


১৯৭০ এর দশকে যখন কল্প-বিজ্ঞানভিত্তিক মুভি সিরিজ ‘ম্যাড ম্যাক্স’ এর প্রথম কিস্তি মুক্তি পায়, তখন সেটা ‘ইনস্ট্যান্ট ক্লাসিক’ মুভির তালিকায় চলে যায়। এর প্রধান কারণ ছিলো- গতানুগতিক কল্পবিজ্ঞান গল্পের সাথে উদ্ভট সব অ্যাকশন সিকোয়েন্সের সমাহার। পারমাণবিক যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিরান পৃথিবীতে কীভাবে মানব সভ্যতা একটু খাদ্য এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে উঠতে পারে- সেটাই ছিলো এই মুভি সিরিজের মূল আলোচ্য বিষয়। এই ‘ম্যাড ম্যাক্স’ হতে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে ‘ফলআউট’ ভিডিও গেইম সিরিজ তৈরি করা হয়েছিলো- যেটা তিন প্রজন্ম পরে এখনো এত জনপ্রিয় যে, খুব শীঘ্রই এই একই নামে একটা টিভি সিরিজ তৈরি করার চিন্তা-ভাবনাও চলছে

ব্যাপার হলো- ম্যাড ম্যাক্সের রক্ত টগবগ করা উন্মাদ সব অ্যাকশন সিকোয়েন্সকে আরো ব্যাপকভাবে ফুটিয়ে তুলতে সহায়তা করেছিলো এর বিশেষভাবে ডিজাইন করা সব যানবাহন। ম্যাড ম্যাক্স সিরিজের প্রতিটা মুভিতেই এসব ভয়াবহ আকৃতির যানবাহনের ছিলো সরব উপস্থিতি। এদের একটা হতে আগুনের হলকা বেরুচ্ছে তো আরেকটা হতে মেশিনগানের মত গুলি ছুটছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো- পারমাণবিক যুদ্ধ পরবর্তী বিরান প্রান্তরে, সীমিত কিছু সম্পদ নিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে নামা উন্মাদ মানবগোষ্ঠীর সদস্যরাই এইসব যানবাহন প্রথম তৈরি করেনি। এসব ভয়াবহ যানের আবির্ভাব ফিকশনের জগতেই প্রথম নয়। বরং বাস্তবে আরো পাঁচশ’ বছর আগেই ভিঞ্চির কল্পনায় এদের আবির্ভাব। ভিঞ্চির কল্পনাদ্ভূত এসব ডিজাইন দেখলে বিরান প্রান্তরের একচ্ছত্র অধিপতি ‘লর্ড হিউমোঙ্গাস’ এরও মাথা খারাপ হয়ে যেতো!

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন

এই লেখার দ্বিতীয় পর্বে ভিঞ্চির ‘ক্লাস্টার বোমা’ তৈরির ডিজাইন নিয়ে আলোচনায় উল্লেখ করেছিলাম- কীভাবে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের মধ্যেকার শত-বর্ষব্যাপী যুদ্ধে ঘোড়া-নির্ভর বাহিনীরা ‘অজেয়’ হতে পুরো ‘অসহায়’ হয়ে পড়েছিলো নিত্য-নতুন সব প্রযুক্তি এবং যুদ্ধ-কৌশলের সামনে। সেই যুদ্ধে ঘোড়সওয়ারী নাইটদের হটিয়ে পাইক-ম্যান এবং ম্যান-অ্যাট-আর্মসদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা পদাতিক বাহিনীরা হয়ে উঠেছিলো যুদ্ধ ময়দানের মূল নিয়ন্ত্রণ শক্তি।

হাজারে হাজারে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে লাখে লাখে পদাতিক বাহিনীর এইভাবে যুদ্ধের ময়দানে আবির্ভাবের পর বাঘা বাঘা যুদ্ধকৌশল বিদেরা চিন্তা করতে লাগলেন কীভাবে ঘোড়া-নির্ভর বাহিনীকে ঢেলে সাজানো যায়। যুদ্ধের ময়দানে পাইক-ম্যানদের অতি পছন্দের টার্গেট ছিলো ঘোড়ারা। ধরুন, তীব্র বেগে নাইট ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসছে। সেটার ভয়ানক গতির সামনে পড়ে বিপক্ষ শিবিরের সৈনিকদের দফারফা অবস্থা। যারা কোনোক্রমে পাশ কাটিয়ে সরে যাচ্ছে তাদেরও নিস্তার নেই। নাইটের খোলা তলোয়ারে পরের মুহূর্তেই তাদের মুণ্ডু ধড় হতে আলাদা। ঠিক এই সময় শত্রুপক্ষের এক ফাজিল পাইক-ম্যান ঘোড়ার ছুটে চলা চার পায়ের মাঝে বাঁধিয়ে দিলো বিশাল লম্বা বর্শা। ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়লো মাটিতে। নাইট ছিটকে পড়লো আরো এক মাইল দূরে। কীভাবে এমন লেজে-গোবরে পরিস্থিতি হতে ঘোড়ার মত একটা দুর্ধর্ষ যুদ্ধের বাহনের উত্তরণ সম্ভব?

উত্তর হচ্ছে- সেই দুর্ধর্ষতার সাথে এক চিমটি উন্মত্ততা যোগ করে দেয়া। ভিঞ্চিও আগালেন সেই পথে। তিনি ডিজাইন করলেন এমন এক ঘোড়ার রথের, যেটার ভয়াবহতা দেখে মানবতাবাদী ‘জেনেভা যুদ্ধ আইন’ প্রণেতারা সবাই হার্ট-অ্যাটাক করে মারা যাবে।

Scythed_chariot_by_da_Vinci
উপরের ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন ভিঞ্চির ডিজাইন করা ‘ঘূর্ণনক্ষম’ ধারালো ব্লেডযুক্ত ঘোড়ার রথ। ‘ডাবল হর্স-পাওয়ার’ বিশিষ্ট (দুই ঘোড়ায় টানা) এই রথকে দুটি আলাদা মডেলে ভিঞ্চি বাজারে নামাতে চেয়েছিলেন। একটায় ঘুরন্ত ব্লেড থাকবে রথে ঘোড়ার অবস্থানের ঠিক সামনে, আরেকটায় থাকবে পেছনে (উপরের ছবি দ্রষ্টব্য)। ঘোড়ারা যখন রথটাকে টেনে নিয়ে যাবে, তখন সেটার চাকার ঘূর্ণনগতি (যেটা ভূমির সাথে লম্ব) রড এবং গিয়ার মেকানিজমের মাধ্যমে সঞ্চারিত হবে ভূমির সমান্তরালে থাকা ধারালো ব্লেডে। সেই ব্লেডটাও তখন বৈদ্যুতিক পাখার মত সাঁই সাঁই করে ঘুরতে থাকবে, আর আশেপাশে থাকা সব বস্তুকে (এক্ষেত্রে ময়দানের সৈন্যদের) মসৃণভাবে কেটে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে এক ঘাস কাটার যন্ত্রকে চালু করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে মাঠে, আর সেটা বিশাল বড় বড় সব দূর্বাঘাস কাটতে কাটতে সুন্দর একটা পথ তৈরি করে সামনে আগাচ্ছে!


ঠিক এমন, তবে কল্পনা করুন- চুলের বদলে পুরো মাথাটাই নেই!

ঠিক এমন, তবে কল্পনা করুন- চুলের বদলে পুরো মাথাটাই নেই!




কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
একটু বেশিই! যারা যুদ্ধ যানটার কার্যপদ্ধতি বুঝেছেন, তারা ইতোমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন যে এই যন্ত্রের শত্রু-মিত্র বাছ-বিচারের কোনো বালাই নেই। যুদ্ধের ময়দানের একধার হতে সে স্রেফ ঘাস কাটার মত করে সবকিছুকে কাটতে কাটতে আগাবে। ভিঞ্চি নিজেও জানতেন তার ডিজাইনের এই ত্রুটির কথা। কিন্তু তাতে খুব একটা ক্ষতি-বৃদ্ধি হয়নি। এর কারণ সম্ভবত ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অভাব। মিলান দু চক্ষে দেখতে পারতো না ভেনিসকে, ভেনিস সহ্য করতে পারতো না জেনোয়াকে, আর জেনোয়া তো পারলে লাঠি নিয়ে তাড়া করে ফ্লোরেন্সকে! এদিকে আগেই বলেছিলাম, ইতালির সৈন্যরা প্রায় সবাই ছিলো বাইরের দেশ হতে ভাড়া করা। মিত্র সংখ্যা কম হবার ফলে যুদ্ধের ময়দানে কে এই যন্ত্রের তলে কাটা পড়লো- সেটা নিয়ে তাই বেশি ভাবতে হয়নি ভিঞ্চিকে। ফলে যেটুকু সময় বেঁচে গিয়েছিলো, সেটুকু সময় তিনি ব্যয় করেছিলেন রথের ডিজাইনের আশপাশে মনের মাধুরী মিশিয়ে সব ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মানুষের শরীর এঁকে তার এই ভয়াবহ আবিষ্কারের কার্যকারিতা প্রমাণে (ছবিতে লক্ষ্য করুন ভালোমতো)। পরে সেটা উপস্থাপন করেছিলেন মিলানের ডিউক ‘লুদভিকো ইল মোরো’ এর নিকট। যদিও পরবর্তীতে মিলানের ডিউক আর এই ভয়াবহ বস্তুটা বানানোর মত পর্যাপ্ত সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেননি।

৮। মেশিন গান


আহ, মেশিন গান! অটোমেটিক বন্দুকদের রাজা। যুদ্ধের ময়দানে প্রতিরোধকারী পক্ষের পরম বন্ধু। বদমাশ ভিলেনের দফা-রফা করতে শোওয়ার্জেনেগার এবং স্ট্যালোনের মত হিরোদের প্রথম পছন্দ! যদিও বন্দুক এবং গান পাউডার ভিত্তিক অন্যান্য অস্ত্রসমূহের আবির্ভাব আরো আগেই ঘটেছিলো, কিন্তু উনিশ শতকের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত মেশিন গানের বাস্তব ব্যবহারের দেখা মেলেনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকান নেভী সর্বপ্রথম যুদ্ধের ময়দানে ‘গ্যাটলিং গান’ নামক এক বস্তুর আমদানি করে। সেটা দিয়েই আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে মেশিন গানের পদচারণা শুরু। কিন্তু মেশিন গান নিয়ে আমাদের সবার কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন মেশিন গানের কথা বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এই ধরনের ছবি।

sylvester-stallone-rambo-ii
অথচ বাস্তবতা হলো- শোওয়ার্জেনেগার কিংবা স্ট্যালোনদের মত হেভি ওয়েট অ্যাকশন হিরোরা যেসব দানবাকৃতির বন্দুক দিয়ে নিয়মিতভাবে ভিলেনদের পশ্চাতদেশের ছাল ছাড়ান, সেগুলোই একমাত্র মেশিন গান নয়। সেগুলো মেশিনগানের এক বিশেষ শ্রেণীতে পড়ে মাত্র, যেটা হচ্ছে ‘হেভি মেশিনগান’। বাস্তবে মেশিনগান পিস্তলের মত অতি হালকা এবং এক হাতে বহনযোগ্যও হতে পারে, যেমন- উজি গান, ম্যাক-১০ ইত্যাদি। টেকনিক্যালি, যে বন্দুকে ট্রিগার শুধু একবার টেনে ধরে রাখলেই সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটানা ফায়ার করে পুরো ম্যাগাজিন খালি করে দিতে পারে- সেটাই মেশিনগান।

আর আরেকটা ভুল তথ্য হলো, মেশিন গান পুরোপুরি আধুনিক মানুষদের আবিষ্কার নয়। এর গোড়াপত্তন মূলত ৫০০ বছর আগে ভিঞ্চির হাতে, সেই সময়ে যখন ঢাল-তলোয়ার আর বল্লম-সড়কির মতো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে একে অন্যের ঘাড়ের উপরে লাফিয়ে পড়ার রীতি প্রচলিত ছিলো!

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমার নীতি খুবই কঠোর : যদি আমার আশেপাশে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, তবে সেটার নিয়ন্ত্রণ আমি আমার হাতেই চাই!  ক্লিন্ট ইস্টউড (আমেরিকায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে এক প্রশ্নের উত্তরে)

কথা হচ্ছে, ‘ক্লিন্ট ইস্টউড’ এই ব্যাপারে পুরোপুরি একা নন। তার বক্তব্যকে “ভালো, মন্দ, কুৎসিত”- যাই মনে হোক না কেন, কথা সত্য! ইতিহাস কলম দিয়ে লেখা হয় না, লেখা হয় বন্দুক দিয়ে। বন্দুকের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, ইতিহাসও তার পক্ষেই সবসময় “হুজুর! হুজুর!” করতে থাকে। যাই হোক, বন্দুকের উদ্ভব ‘গান পাউডার’ নামক যে উপাদান হতে, সেই গান পাউডারের আবির্ভাব ঘটে সর্বপ্রথম চীনে নবম শতকের দিকে। কিন্তু সেই গান পাউডার হতে আধুনিক বন্দুকের মত কাছাকাছি যন্ত্রের আবির্ভাব ঘটতে সময় লাগে আরো প্রায় তিনশত বছর। চাইনিজ সেনাবাহিনীতে দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগে যোগ করা হয় ‘হ্যান্ড ক্যানন’ বিশিষ্ট সৈনিকদের। তবে সেই হাত কামানগুলোকে পরবর্তীতে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করে তুর্কীরা তাদের দুর্ধর্ষ ‘জেনিসারী’ বাহিনীর মাধ্যমে।

হাত কামান প্রযুক্তি দিয়ে চাইনিজ এবং টার্কিশরা মধ্যযুগের ইতিহাসে নিজেদের সুপার-পাওয়ার হিসেবে অধিষ্ঠিত করলেও যুদ্ধের ময়দানে এসব হ্যান্ড ক্যানন ব্যবহার করা ছিলো বেশ ঝামেলাপূর্ণ। প্রথমত, প্রতিবার গুলি ছোঁড়ার পর ধৈর্য ধরে বসে বসে রিলোডিং করা ছিলো অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। দ্বিতীয়ত, কিছুক্ষণ পরপরই যাচাই করে দেখে নিতে হতো ব্যারেলগুলো বেশী উত্তপ্ত হয়ে উঠছে কিনা। বেশী উত্তপ্ত হলে হাত কামান গুলি ছোঁড়ার বদলে নিজের মুখের উপরেই ফেটে যাবে। আর সেই সাথে বোনাস উত্তেজনা হিসেবে ছিলো- নিখুঁত নিশানা-ভেদে এসব হাত কামানদের ব্যর্থতা। যথারীতি, ভিঞ্চি ভাবতে বসলেন হাত কামানের এসব সংকট দূর করার ব্যাপারে। কিন্তু তাঁর জিনিয়াস মাইন্ড আমাদের সাধারণ আই-কিউ বিশিষ্ট মানুষদের ব্রেইনের মতো ‘হ্যান্ড ক্যানন’ হতে ‘হ্যান্ড গান’ এ যায়নি। সেটা সরাসরি চলে গেলো ‘মেশিন গান’ এ!

gun_l
উপরে দেখতে পাচ্ছেন ভিঞ্চির ডিজাইন করা আগ্নেয়াস্ত্র, যেটাকে নির্দ্বিধায় প্রথম প্রজন্মের মেশিন গান বলা যায়। যেহেতু, তার সব আবিষ্কারকে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিবিশিষ্ট না করা পর্যন্ত ভিঞ্চির পেটের ভাত হজম হতো না, সেহেতু তিনি তার এই আবিষ্কারকেও স্বয়ংক্রিয় করে ফেললেন। এই মেশিন গানে গুলি ছোঁড়া বন্ধ না করেই একই সময়ে ব্যারেল ঠাণ্ডা করার এবং বুলেট লোড করতে থাকার ব্যবস্থা ছিলো। ছবিতে যেমন দেখতে পাচ্ছেন- এই মেশিন গানে একটা কাঠের তৈরি প্রিজম আকৃতির ফ্রেমে প্রতি সেটে এগারটা করে তিন সেটে মোট ব্যারেলের সংখ্যা ছিলো তেত্রিশটা। এক সেটের ফায়ারিং শেষ হবার সাথে সাথে মেশিন গানটার দায়িত্বে থাকা একজন সৈনিক সামনের প্রিজম আকৃতির কাঠের ফ্রেমটা ঘুরিয়ে দিতো। ফলে সদ্য ব্যবহৃত ব্যারেলগুলো কিছুক্ষণের জন্যে অবসরে চলে যেতো ঠাণ্ডা হবার উদ্দেশ্যে, আর নতুন এক সেট ব্যারেল সম্মুখে চলে আসতো ফায়ারিং এর লক্ষ্যে। যে দুই সেট অবসরে থাকতো, সৈনিকেরা বসে বসে সেই দুই সেটের ব্যারেলে বুলেট লোড করতো- ঠিক একই সময়ে যখন ফায়ারিং করতে থাকা হতো তৃতীয় সেটের ব্যারেলগুলো হতে। বুলেটের কথা যখন আসলোই, তখন ভিঞ্চির ডিজাইন করা এই মেশিনগানের বুলেটগুলোও দেখুন।

17795
কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
টার্কিশ জেনিসারীরা রণক্ষেত্রে যতটা ভয়াবহ ছিলো- সেটাকে গুণ দিন তিন দিয়ে (হাত কামানের রিলোডিং, ওভার হিটিং এবং নিখুঁত নিশানা-ভেদের সমস্যা দূর করতে পারার জন্যে)। তারপর প্রাপ্ত সংখ্যাটাকে আবার গুণ দিন তেত্রিশ দিয়ে (তেত্রিশটা ব্যারেলের জন্যে)। সর্বশেষ ফলাফল যেটা পেলেন, সেটাই ভিঞ্চির মেশিন গানের কার্যকারিতা মাত্রা। অর্থাৎ ভিঞ্চির সমসাময়িক সব গান পাউডার প্রযুক্তির (বড় কামান বাদে) তুলনায় নিরানব্বই গুণ শক্তিশালী ছিলো তার আবিষ্কৃত এই মেশিন গান! ভিঞ্চি আদর করে তার এই আবিষ্কারের নাম রেখেছিলেন ‘অর্গান’, যেটা আমাদের মতে- ভিঞ্চির পক্ষ হতে আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মানুষদের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া এক নির্মম রসিকতা ব্যতীত আর কিছুই নয়। কপাল ভালো, ভিঞ্চি পরে আর এই ভয়াবহ জিনিসটা বানানোর জন্যে সময় বের করে উঠতে পারেননি। তাই, আমাদের আরেকটা বাস্তব এবং কার্যকর মেশিনগান পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধার আগ পর্যন্ত।

৯। মরণ-রশ্মি বা ডেথ-রে


সায়েন্স ফিকশনের এক অনবদ্য উপাদান হলো ‘ডেথ-রে’। বহুযুগ ধরে সায়েন্স ফিকশন আমাদের লেজার মারণাস্ত্রের লোভ দেখিয়ে রাতের ঘুম হারাম করিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত সেই রকম ভয়ংকর কোনো লেজার মারণাস্ত্রের দেখা আমরা পাইনি। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত ভয়ংকর ডেথ-রে বলতে আছে এই জিনিসটা,


আতশ কাঁচ- পিঁপড়েদের লাইফ সফলতার সাথে তামা তামা করে আসছে, সেই ১৯৫৩ সাল থেকে!

আতশ কাঁচ- পিঁপড়েদের লাইফ সফলতার সাথে তামা তামা করে আসছে, সেই ১৯৫৩ সাল থেকে!




কথা হচ্ছে, ডেথ-রে আধুনিককালে নিকোলা টেসলার মত দুর্ধর্ষ প্রযুক্তিবিদই প্রথম আবিষ্কার করে যাননি। এবং না, এটার সূত্রপাত তালিকার বাকি সব নামগুলোর মত ভিঞ্চির হাতেও হয়নি। এটার সূত্রপাত হয়েছিলো খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে তৃতীয় শতকে বিজ্ঞানী ‘আর্কিমিডিস’ এর হাতে। কিন্তু ভিঞ্চি আর্কিমিডিসের সেই আবিষ্কারকে আরো ভয়াবহ রূপদান করেছিলেন।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
আর্কিমিডিসের মতো ভিঞ্চিও জানতেন সৌররশ্মির ক্ষমতা সম্পর্কে। আমরা যেখানে শৈশবে আতশ-কাঁচ দিয়ে পিঁপড়েদের মতো পরিশ্রমী প্রাণীদের জীবনটা তামা তামা করতে ব্যস্ত ছিলাম, সেখানে ভিঞ্চি স্বপ্ন দেখেছিলেন আরো বড় কিছুর। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আশেপাশের এলাকা হতে অনেকগুলো আয়নার মাধ্যমে সমস্ত সৌর রশ্মি সংগ্রহ করে সেটাকে এক বিন্দুতে স্থির করলে ফলাফলটা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে। এই চিন্তা-ভাবনা হতেই তিনি কিছু আঁকিবুঁকি করেছিলেন, যেটা পরে পাওয়া গিয়েছিলো তারই রচিত ‘কোডেক্স অ্যাটলান্টিকা’ নামক গ্রন্থে।

web-fire2
ভিঞ্চির ইচ্ছা ছিলো কেন্দ্রীভূত সৌর রশ্মির এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি কিছু যন্ত্রপাতি বানাবেন। যেমন- ধাতু ঝালাই (soldering) করার যন্ত্র, পানি গরম করার যন্ত্র, ইত্যাদি। ইতালির ফ্লোরেন্টিন অঞ্চল ছিলো উলের পোশাক উৎপাদনের জন্যে বিখ্যাত। ভিঞ্চি পরিকল্পনা করেছিলেন আধা মাইল ব্যাসার্ধ ব্যাপী এমন এক আয়না বানাতে যেটা দিয়ে পুরো ফ্লোরেন্টিন অঞ্চলের উল পোষাকশিল্পের জন্যে গরম পানি সরবরাহ করা যাবে। সেই সাথে চেয়েছিলেন বাসা-বাড়ির সুইমিং পুলগুলোতেও গরম পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে। কারণ-  ‘জাকুজি’ এর হট পানিতে আরাম পেতে কে না পছন্দ করে? রোমানরা তো বটেই!


হট!!

হট!




কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
ভিঞ্চির এই ডিজাইনকে সাধারণ আয়না বলে অভিহিত করা আসলে ভুল। সাধারণ আয়নারা শুধু সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে। কিন্তু ভিঞ্চির ডিজাইনে ব্যবহৃত আয়নাগুলো সূর্যের আলোর ক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখতো। সেগুলো ‘অ্যামপ্লিফায়ার’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম ছিলো। কেউ চাইলে এসব আয়না কোনো টাওয়ারের উপর স্থাপন করে সমুদ্রের উপরে ভাসমান শত্রু জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু সেটা আর পরে করা হয়ে ওঠেনি। কে জানে, হয়তো সেটাই হতো আমাদের ‘ডেথ স্টার’ তৈরি করার প্রথম পদক্ষেপ!

আমাদের এই পুরো ‘ভিঞ্চি’ ট্রিলজির সারকথা হলো- এটা মানবজাতির সৌভাগ্য যে রেনেসাঁ যুগের মাস্টার মাইন্ড ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ এসব ভয়াবহ আবিষ্কারের চেয়ে তার রং-তুলির ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে বেশী পছন্দ করতেন। যদি সত্যি সত্যি তিনি ক্যারিয়ার সুইচ করে বন্ড ভিলেন হিসেবে আবির্ভূত হতেন, তবে সেই মুভিতেই আমাদের এজেন্ট ‘জিরো জিরো সেভেন’ এর দফা-রফা হয়ে যেতো। ব্লু-প্রিন্ট চুরি করতে ভিঞ্চির দুর্ভেদ্য দুর্গে ঢুকতে গিয়েই হয়তো সোলার টাওয়ারের রশ্মিতে বেঘোরে মারা পড়তো, না হয় ক্লাস্টার বোমায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কিংবা ব্লু-প্রিন্ট চুরি করে ট্যাংকে চড়ে পালানোর সময় হয়তো রোবট আর্মির সামনে পড়ে দফা-রফা হয়ে যেতো। অথবা কে জানে, মুভির শেষ ফাইটে হয়তো স্বয়ং ভিঞ্চি তার উড়ুক্কু যানে করে জিরো জিরো সেভেনকে ধাওয়া করতেন আর মেশিন গানের গুলিতে এজেন্টের এমনভাবে দফা-রফা করে দিতেন যে ‘বন্ড’ মুভির কোনো সিকুয়েল বানানোরও আর সুযোগ থাকতো না!


"মাই নেইম ইজ ভিঞ্চি......লিওনার্দো দি স্যার পিয়েরো দ্যা ভিঞ্চি!"

“মাই নেইম ইজ ভিঞ্চি……লিওনার্দো দি স্যার পিয়েরো দ্যা ভিঞ্চি!”




 

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/vinci_as_bond_villain_03/

Wednesday, October 2, 2019

কেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ একজন বন্ড ভিলেন হবার জন্যে উপযুক্ত – ২য় পর্ব


আমরা জেনেছিলাম রেনেসাঁ যুগের ইতালিয়ান আবিষ্কারক লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কিছু তুলনামূলক ভাবে কম আলোচিত আবিষ্কারের কথা, যেগুলো তাকে যে কোনো বন্ড মুভিতে ভিলেনের রোল পাইয়ে দেবার জন্যে যথেষ্ট। সত্যি কথা হলো, এমআই সিক্সের সব ফিউচারিস্টিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা এজেন্ট ‘জিরো জিরো সেভেন’ যদি মধ্যযুগে ভিঞ্চির এসব প্রযুক্তিগত আবিষ্কার দেখতো, তবে সেও নির্দ্বিধায় মূর্ছা যেতো। কারণ ভিঞ্চির কিছু কিছু আবিষ্কারের আইডিয়া এতই ফিউচারিস্টিক ছিলো যে সেগুলোকে বাস্তবে কার্যকর করতে আমাদের প্রায় চারশ’-পাঁচশ’ বছরের মতো সময় লেগে গেছে। যেমন বলা যায়-

সাবমেরিন

আজকাল ‘মেরিন ওয়ারফেয়ার’ বা ‘পানির মধ্যে যুদ্ধের কলা-কৌশল’ জানা ছাড়া কোনো দেশেরই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করা সম্ভব নয়। আর এই মেরিন ওয়ারফেয়ারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা হচ্ছে সাবমেরিনের। কিন্তু এই সাবমেরিন কিছুকাল আগেও ছিলো শুধুমাত্র মানুষের কল্পনায়। উনিশ শতকের জুল ভার্ন রচিত কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যসমূহে সাবমেরিনের কথা পড়ে সেই সময়ে অনেকেরই পিলে চমকে গিয়েছিলো। কপাল ভালো তারা পনেরশ’ শতকে জন্ম নেয়নি। কারণ, সেই সময়ে জন্ম নিলে হয়তো ভিঞ্চির আবিষ্কৃত সাবমেরিন দেখে তারা হার্ট অ্যাটাক করেই মারা যেতো।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
ভিঞ্চির আমলে, তখন পর্যন্ত অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে না পারা, ইতালির সবচেয়ে শক্তিশালী দুই সুপার-পাওয়ার ছিলো ‘ভেনিস’ এবং ‘জেনোয়া’। ভেনিস এবং জেনোয়া- উভয়েরই ছিলো অপ্রতিরোধ্য নৌ-বাহিনী। ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে কেউ এই দুই সুপার-পাওয়ারের সাথে অবস্থান করে টিকে থাকতে চাইলে সামনে রাস্তা খোলা ছিলো দুটো।

১। তাদের সব কথার প্রত্যুত্তরে “ইয়েস বস” বলা। অথবা,
২। তাদের সাথে সমান তালে ‘পাংগা’ নিতে সক্ষম নিজস্ব এক নৌ-বাহিনী থাকা।

কিন্তু সেই আমলে চলমান ক্রুসেডের ফলে ঘটা ক্ষয়ক্ষতির কারণে দ্বিতীয় পথ বেছে নেবার মত শক্তিমত্তা সম্পন্ন আর কেউ ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অবশিষ্ট ছিলো না। তাই, তুর্কীরা এই দুর্বলতার সুযোগে বিশাল নৌবহর নিয়ে ইতালির উপকূলে উপস্থিত হবার আশংকায়, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার্থে এগিয়ে এলেন ‘মাস্টারমাইন্ড’ ভিঞ্চি। তিনি বানালেন নিচের ছবিতে উপস্থাপিত বস্তুটা।

367241a9fea920c38b040c24a4cbc5f9
জ্বি হ্যাঁ, এটা একটা সাবমেরিন যেটার মাথায় বসানো আছে দানবাকৃতির এক ধারালো ছুরির ফলা। ভিঞ্চি জানতেন, ভেনিস কিংবা জেনোয়ার বিশাল নৌ-বহরের সাথে জলের উপরিভাগে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে যাওয়া আর খালি হাতে জলে নেমে কুমীরের সাথে কুস্তি করা একই জিনিস। দুনিয়াতে তো সবাই আর ‘এইস ভেঞ্চুরা’ নয়। তাই তিনি আগালেন সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে। জলের নিচে দিয়ে। এরকম দু-চারটা সাবমেরিনই পুরো ভেনিস এবং জেনোয়ার নৌ-বহরের তলায় ফুটো করে দিয়ে তাদের সলিল সমাধি ঘটাতে যথেষ্ট ছিলো। সেই সাথে যথেষ্ট ছিলো মন্দিরে ‘পসাইডন’ দেবতার পাশে নিজের আরেকটা মূর্তি স্থাপন করে সেটার সামনে সবাইকে গড় হয়ে প্রণাম করাতে। কারণ উপস্থিত সবাই দেখতো- কোনো কারণ ছাড়াই একের পর এক যুদ্ধ জাহাজ পানির নিচে সিরিয়াল ধরে ডুবে যাচ্ছে।

কিন্তু বাকি আরো কিছু আবিষ্কারের মত ভিঞ্চি তার এই আবিষ্কারটার কথাও বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন- কী ভয়াবহ জিনিস তিনি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। ফলে তার মৃত্যুর পরে বারো ভলিউমের ‘কোডেক্স অ্যাটলান্টিকাস’ প্রকাশ হবার আগ পর্যন্ত কেউ কিসসু টের পায়নি এই আবিষ্কারের ব্যাপারে।

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
ভিঞ্চির এই সাবমেরিনের কার্যকারিতা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো প্রশ্নের উদয় হয়নি। এতেই বুঝা যায় কতটা নিখুঁত ছিলো তার এই ডিজাইন। কিন্তু একটা ব্যাপার। এই সাবমেরিন যারা চালাবে (টেকনিক্যালি দাঁড় বাইবে যারা) তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারটায় কী চিন্তা করেছিলেন ভিঞ্চি? তারা অতল জলরাশিতে কীভাবে…………

.

.

.


"ওহ......আচ্ছা! আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি।"

“ওহ……আচ্ছা! আমার প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি।”




উপরের ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন ভিঞ্চির ডিজাইন করা ‘স্কুবা গিয়ার’। কোনো কারণে জাহাজ ধ্বংস না করে সেটা দখল নিতে চাইলে সৈন্যরা প্রথমে সাবমেরিন দিয়ে জাহাজের কাছাকাছি পৌঁছাবে। তারপর ভিঞ্চির ডিজাইন করা এই ‘স্কুবা গিয়ার’ পরিহিত বিশেষ কমান্ডো বাহিনী অন্ধকারে জাহাজের ডেকে উঠে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে দখলে নিয়ে ফেলবে পুরো জাহাজ। যদিও আমাদের মতে- হামলা চালানো ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়িই বটে। শুধু এই গিয়ার পরে পানি হতে জাহাজের ডেকে উঠে আসলেই কাজ হয়ে যাবার কথা ছিলো বলে আমাদের বিশ্বাস। মধ্যযুগীয় কোনো সৈন্য এই মূর্তিমান আতংককে সামনাসামনি দেখেও যদি জাহাজ থেকে পানিতে লাফ না দেয়, তাহলে এর মানে দাঁড়ায় দুটো। হয় সে ইতোমধ্যেই মারা গেছে, না হয় ভয়ে জমে এতটাই বরফ হয়ে গেছে যে তার আর নড়াচড়ার ক্ষমতা অবশিষ্ট নেই।

এই স্কুবা গিয়ারের ভেতরে অত্যন্ত জটিল সব ডিজাইন খুঁজে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সরলটা হলো ‘মূত্র সংরক্ষণকারী থলে’, যেটা বর্তমানের স্কুবা ডাইভারদের স্যুটের মাঝেও পাওয়া যায়। এটার কাজ হলো পানির নিচে ডাইভারকে উষ্ণতা প্রদানে সহায়তা করা। অর্থাৎ উনিশ শতকে মানুষ যখন সবে সাবমেরিন কল্পনায় দেখা শুরু করেছিলো, তার চারশ’ বছর আগেই ভিঞ্চি শুধু সাবমেরিনই বানিয়ে যাননি। তিনি সেই সাথে প্রতিষ্ঠা করে গেছিলেন তার নিজস্ব ‘নেভী সীল (Seal) বাহিনী’!

ক্লাস্টার বোমা

কম পরিশ্রমে বহু সংখ্যক মানুষ নিধনে যখন মানবসভ্যতা নিত্য-নতুন উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছিলো, তখন ২য় বিশ্বযুদ্ধের কিছু সময় আগে ক্লাস্টার বোমার আবির্ভাব। ক্লাস্টার বোমার মূলনীতি হলো “এক ঢিলে অনেক-অনেক পাখি”। এই বোমায় একটা শেলের ভেতরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক বোমা ভরে দেয়া থাকে। সেই শেল ছোঁড়া হলে সেটা মাটিতে পড়ার আগেই ফেটে যায়, আর ভিতরের ক্ষুদ্র বোমাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে চারপাশে। পরে সেগুলো আরেক দফায় বিস্ফোরণ ঘটায়। এরকম শুধু একটা শেল দিয়েই বিশাল এক এলাকা পুরো ধ্বসিয়ে দেয়া সম্ভব।

কথা হচ্ছে, বিংশ শতাব্দীতে এসে ক্লাস্টার বোমা নিয়ে মানবসভ্যতা বেশ পুলক অনুভব করলেও ভিঞ্চি এই ভয়াবহ জিনিসটার আইডিয়া তৈরি করে গেছেন আরো ৫০০ বছর আগেই।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
ফ্রান্স বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যেকার শতবর্ষ ব্যাপী (১৩৩৭-১৪৫৩) যুদ্ধে মধ্যযুগীয় রণকৌশলে আমূল পরিবর্তন চলে এসেছিলো। এই যুদ্ধের আগে ঘোড়সওয়ারী নাইটদের দুর্জেয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু পাঁচ প্রজন্ম ধরে চলা এই যুদ্ধে ঘোড়সওয়ারী নাইটেরা হয়ে পড়েছিলো পুরোপুরি অসহায়। ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত নাইটেরা যেখানে ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধ করতো, সেখানে রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড একই খরচে গড়ে তুলেছিলেন তিনগুণ বড় পদাতিক বাহিনী। তারা অতি হালকা বর্ম পরতো। তীরন্দাজ, পাইক ম্যান এবং ম্যান-অ্যাট-আর্মস এর সমন্বয়ে গড়ে তোলা বাহিনী হালকা বর্ম পরলেও যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা গেলো তারাই কার্যকর বেশি। একে তো তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে চলতে এবং অস্ত্র চালাতে পারে; তার উপর যে খরচে একটা নাইট বাহিনী গড়ে তোলা হয়, সেই একই খরচে তার তিনগুণ আয়তনের এই পদাতিক বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব ছিলো। যেকোনো স্ট্রাটেজি ভিডিও গেমারকে জিজ্ঞেস করলেও তিনি সুন্দর করে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতে পারবেন- নাইটদের নিকট ‘পাইক ম্যান-ম্যান অ্যাট আর্মস’ কম্বিনেশন কেন পুরো দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো!


দুঃস্বপ্ন!!

দুঃস্বপ্ন!




যাই হোক, শতবর্ষ ব্যাপী এই যুদ্ধ হতে অন্যান্য দেশ নতুন রণকৌশল সম্পর্কে বেশ ভালোই শিক্ষা নিয়েছিলো। তারাও পাইকারি হারে পাইক-ম্যানদের নিয়ে বাহিনী গঠন করতে শুরু করে দিলো। ফলে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিলো, এই বিশাল সংখ্যক পদাতিক বাহিনীকে কীভাবে ঠেকানো যাবে? স্পেন, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের অগণিত পদাতিক বাহিনীর সামনে ইতালি কীভাবে নিজেদের স্বল্প সংখ্যক সৈন্য (যাদের অধিকাংশই বাইরের দেশ হতে ভাড়া করা) দিয়ে নিজেদের প্রাসাদ এবং দুর্গ প্রতিরক্ষা করবে? যথারীতি এগিয়ে এলেন ভিঞ্চি।

tumblr_n4368oGKFc1rwjpnyo1_500
তিনি ডিজাইন করলেন এমন এক কামানের যেটার একশ গজের ভেতরে আসতে আসতেই শত্রুপক্ষের পুরো পদাতিক বাহিনী কচুকাটা হয়ে একটা সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত সংখ্যায় চলে আসবে। ইতালির শুধু প্রয়োজন হবে ক্ষুদ্র একটা দলের- যারা সেই কামানগুলোকে পাহারা দিবে, আর অনবরত এর ভেতরে ‘বিশেষ ধরণের গোলার’ জোগান দিবে। পরবর্তীতে বাকীরা গিয়ে সেই পদাতিক বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যদের শেষ করবে।

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
ভিঞ্চির ডিজাইন করা কামানের প্রতিটা গোলার ভেতরে ভরে দেয়া ছিলো অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরের টুকরো। যখন কামান হতে গোলাটা ছোঁড়া হতো, তখন সেই গোলাটা ফেটে যেতো আর পঙ্গপালের মত প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসতো তীক্ষ্ম সব পাথরের টুকরো। ব্যাপারটাকে অনেকটা বলা যায় কোন যন্ত্র দিয়ে পাথরের টুকরো স্প্রে করার মত, যেখানে চূর্ণ করা টুকরোগুলো প্রচণ্ড বেগে বৃষ্টির মতো এসে আঘাত হানতো শরীরে।

যারা এখনো বুঝতে পারছেন না এই কামানের ভয়াবহতা, তারা কখনো সুযোগ পেলে দু-চার মিনিট শিলা বৃষ্টির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করুন।

Biggest_Ice_rain_car

উড়ুক্কু যান

আকাশে উড়ার সাধ ছিলো মানুষের আজন্ম লালিত। সেই অনাদিকাল হতে কল্পনাবিলাসী মানুষ মাটিতে শুয়ে আকাশে পাখিদের ওড়া-উড়ি দেখতো আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতো। কিন্তু পাখিরা মানুষের মাথায় মলত্যাগ করে এই ব্যাপারটাই স্মরণ করিয়ে দিতো যে- আকাশের সীমানায় রাজত্ব শুধু তাদেরই, কোন মানুষের নয়। জবাবে অটো লিলিয়েনথেল এবং রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের মত বিজ্ঞানীরা কোমর বেঁধে নামলেন আকাশে মানুষের ক্ষমতা অধিষ্ঠিত করতে। তাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আজ শুধু ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডল নয়, মহাশূন্যেও মানুষের পদচারণা অতি নিয়মিত এক ব্যাপার।

কিন্তু কথা হলো, আকাশে আধিপত্য বিস্তারের প্রশ্নে লিলিয়েনথেল কিংবা রাইট ভাইদের মাধ্যমেই মানুষের পর্দায় আবির্ভাব ঘটেছিলো- একথা সত্যি নয়। বরং সফলভাবে এই রহস্য উদঘাটনে মানুষদের পর্দায় আবির্ভাব ঘটেছিলো সেই ভিঞ্চির আমলেই– পুরোপুরি ব্যাটম্যান স্টাইলে!

medium
ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
ভিঞ্চির রেখে যাওয়া সব নোট, খাতাপত্র এবং ডায়েরি ঘেঁটে তার বিভিন্ন প্রশ্ন ও চিন্তা-ভাবনার মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি খুঁজে পাওয়া গেছে, সেটা হলো- কী করে মানুষের পক্ষে আকাশে উড়া সম্ভব? শুধু এই এক প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়েই ভিঞ্চি তার জীবনের এক বড় অংশ ব্যয় করে ফেলেছিলেন। তার ডায়েরি এবং খাতার পাতার জায়গায় জায়গায় ভর্তি ছিলো ডানা মেলা পাখিদের নানারকম স্কেচে। তিনি পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পর্যবেক্ষণ করেছিলেন বাদুড়দের উড়ার কৌশলকে। যার ফলাফল ছিলো নিম্নরূপ-

ছবিতে যেটা দেখতে পাচ্ছেন তার নাম হচ্ছে ‘অর্নিথপ্টার (Ornithopter)’। এটাকে সাধারণ ‘গ্লাইডার’ এর মত ভাবলে ভুল করবেন। অর্নিথপ্টার ছিলো গ্লাইডারের থেকেও বেশী কিছু। এই যন্ত্রে পাইলট মাটির দিকে মুখ করে পুরো শরীর ভূমির সমান্তরালে রেখে অবস্থান গ্রহণ করতো। পায়ের কাছে ছিলো একজোড়া পেডাল। সেই পেডাল রড এবং পুলি সিস্টেমের মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলো যন্ত্রটার দুই ডানার সাথে। যখন পা দিয়ে পেডাল ঘোরানো হতো, তখন পাখিদের ডানা ঝাপটানোর মত করে যন্ত্রটার দুই ডানা উপরে-নিচে সমানে ঝাপটে চলতো।

এক ডানা হতে আরেক ডানা পর্যন্ত পুরো যন্ত্রটার দৈর্ঘ্য ছিলো ৩৩ ফুট। যন্ত্রে বিভিন্ন কাঠের ফ্রেমগুলো বানানো হয়েছিলো পাইন গাছের মত হালকা কিন্তু দৃঢ় কাঠ দিয়ে। কাপড়ের অংশে ব্যবহৃত হয়েছিলো সিল্কের কাপড়। পায়ের কাছে পেডালের সাথে সাথে হাতের কাছেও ক্র্যাঙ্কের (Crank) এর মত একটা বস্তু ছিলো, যেটার ভূমিকা ছিলো অনেকটা গিয়ারের মত। অর্থাৎ ক্র্যাঙ্কটা ঘুরিয়ে যন্ত্রের ডানা-ঝাপটানোর হার বাড়ানো-কমানো যেতো। আর উড়ার সময় দিক নির্দেশ করার জন্যে মাথার কাছে ছিলো আরেকটা বিশেষ ‘হেড পিস’।

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
এই যন্ত্রের সমস্যা ছিলো একটাই। ভূমি হতে আকাশে উড্ডয়ন। উঁচু পাহাড় বা বিল্ডিং এর ছাদ হতে যন্ত্রটা নিয়ে লাফিয়ে পড়া ছাড়া এটাকে বাতাসে ভাসানোর আর কোন উপায় ছিলো না। কিন্তু কোনক্রমে একবার বাতাসে ভাসাতে পারলেই যন্ত্রটা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উড়ে বেড়ানো যেতো। অর্থাৎ, যন্ত্রটা আকাশে উড়ার ক্ষেত্রে সফল হলেও প্রাথমিকভাবে ভূমি হতে পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের বিপক্ষে গিয়ে আকাশে উড্ডয়ন করানোর মত যথেষ্ট শক্তির যোগান দেয়া সম্ভব হয়নি এই যন্ত্রটাতে। এর প্রথম কারণ ছিলো, সেই সময়কার প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। আর দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো, এই যন্ত্রটা নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে সাহসী ভলান্টিয়ারের অভাব। ফলে ভিঞ্চিকে যন্ত্রটার এই আপাত কিছু গুণ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিলো………এবং না, পরে কোনো চোরেদের সংগঠন জাতীয় কিছুর সহায়তায়ও এই যন্ত্রের পরীক্ষণে ভিঞ্চি আর উৎসাহী হননি।


সত্য কথা বলেন- কতক্ষণ যাবত এই ছবিটা আসার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন?

সত্য কথা বলেন- কতক্ষণ যাবত এই ছবিটা আসার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন?




কিন্তু তারপরেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। যদি কোনভাবে পাইলটের জরুরি ভিত্তিতে অবতরণের প্রয়োজন হয়- তাহলে? মানে ধরুন, কোনোভাবে আকাশে উড়ার সময় যন্ত্রটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর……

.

.

.

.


"অ্যাঁ-মানে-ইয়ে......ধুর! ভিঞ্চির আবিষ্কার নিয়ে আর কোনো প্রশ্নই করবো না।"

“অ্যাঁ-মানে-ইয়ে……ধুর! ভিঞ্চির আবিষ্কার নিয়ে আর কোনো প্রশ্নই করবো না।”




উপরের ছবিতে দেখছেন ভিঞ্চির ডিজাইন করা প্যারাসুট। আধুনিক প্যারাসুটের সাথে এর তফাৎ ছিলো- আধুনিক প্যারাসুট ভিঞ্চিরটার মত পিরামিড আকৃতিবিশিষ্ট নয়। ফলে অনেক ‘অ্যারোডায়নামিক্স’ বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছিলেন- এটা বাতাসের বাধাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে কোনো মানুষকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখতে এবং নিরাপদ অবতরণ করাতে সক্ষম হবে না। এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতে ‘ডেয়ার ডেভিল’ নামে খ্যাত ব্রিটিশ স্কাই-ডাইভার ‘অ্যাড্রিয়ান নিকোলাস’ ২০০০ সালে হুবহু একই ধরনের একটা প্যারাসুট বানান আর ১০,০০০ ফুট উঁচুতে থাকা বেলুন হতে লাফ দেন। ৭,০০০ ফুট উচ্চতায় নেমে আসার পরে তিনি তার সেই প্যারাসুট খুলেন এবং তথাকথিত ‘অ্যারোডায়নামিক্স’ বিশেষজ্ঞদের মুখে ছাই ঢেলে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করেন।

DaVinci-Parachute002
পরবর্তীতে তিনি মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন– ভিঞ্চির ডিজাইন করা প্যারাসুটের মাধ্যমে “আধুনিক প্যারাসুটের চেয়েও অনেক মসৃণভাবে” তিনি মাটিতে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন, “It took one of the greatest minds who ever lived to design it, but it took 500 years to find a man with a brain small enough to actually go and fly it”.

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/vinci_as_bond_villain_02/

Monday, September 2, 2019

কেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ একজন বন্ড ভিলেন হবার জন্যে উপযুক্ত – ১ম পর্ব


আধুনিক যুগে পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বীয় জগতের ডন যদি হন আইনস্টাইন, তাহলে মধ্যযুগে সেই ডন ছিলেন নিউটন। ঠিক তেমনি ফলিত বিজ্ঞানের আধুনিক যুগের ডন যদি হন নিকোলা টেসলা, তাহলে মধ্যযুগে সেটা ছিলেন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’। বস্তুতপক্ষে, টেসলার সাথে ভিঞ্চির মিল অসাধারণ! দুজনেই ছিলেন শিল্পের ভালো সমঝদার (ভিঞ্চি ছিলেন দুর্ধর্ষ চিত্রশিল্পী আর টেসলা ছিলেন দুর্ধর্ষ কবি)। দুজনেই ছিলেন অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী। দুজনেই অন্য কারো কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া ব্যতিরেকেই, প্রায় শূন্য হতে ম্যাজিকের মত আইডিয়া মাথায় এনে সেটা নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সক্ষম ছিলেন। দুজনের কাছেই বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্ররা ছুটে গিয়েছিলো অলৌকিক সব ক্ষমতা পাবার উদ্দেশ্যে (ভিঞ্চির নিকট গিয়েছিলো কিংবদন্তীতুল্য এক অ্যাসাসিন, আর টেসলার নিকট গিয়েছিলো কিংবদন্তীতুল্য এক ম্যাজিশিয়ান)। দুজনেরই সব আবিষ্কারের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে আমাদের, সৃষ্টির সেরা বুদ্ধিমান প্রাণীদের, মোটামুটি ১০০ বছরের মত সময় লেগে গেছে।

দুজনের মাঝে এত এত মিল দেখে যখন আমরা বিজ্ঞানযাত্রা হতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ‘নিকোলা টেসলা’ কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধের একটা প্রিকুয়েল (Prequel) নামাতে, যেখানে মূলনায়ক থাকবেন মধ্যযুগের আবিষ্কারকদের ডন ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’, তখন আমাদের চোখ পড়লো ভিঞ্চির কিছু আবিষ্কারের দিকে। আর আমরা সিদ্ধান্তে আসলাম টেসলার সাথে এখানেই ভিঞ্চির সবচেয়ে বড় ফারাক। টেসলা যদি হন বন্ড মুভির ‘কিউ’, তাহলে ভিঞ্চি হচ্ছেন সেই মুভির পুরাদস্তুর একজন বন্ড ভিলেন। মধ্যযুগে ইউরোপে যদি ‘এমআই-সিক্স’ এর অস্তিত্ব থাকতো তবে তারা এজেন্ট ‘জিরো জিরো সেভেন’ কে লেলিয়ে দিতো ভিঞ্চির পেছন পেছন।


"মাই নেইম ইজ বন্ড.........জেমস বন্ড!"

“মাই নেইম ইজ বন্ড………জেমস বন্ড!”




কারণ জানতে চান? তাহলে তাকান নিচে ভিঞ্চির বিভিন্ন আবিষ্কারের আইডিয়ার মাঝে-

অসাধারণ রকমের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ


বন্ড ভিলেন হবার প্রথম শর্ত হচ্ছে এটা। ভিলেন তার মাস্টারপ্ল্যান বানাবে তার নিজস্ব এক গোপন দুর্গে বসে (যদিও বন্ড সিরিজের সর্বশেষ কিছু পর্বে এই ধারণাটাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে)। এই দুর্গে অনুপ্রবেশের চিন্তা করা দূরের কথা, মোটামুটি মাইল দুয়েকের ভেতর যাবার চেষ্টা করলেই বেঘোরে মারা পড়তে হবে। ভিঞ্চিও তৈরি করেছিলেন এমন এক দুর্গের ডিজাইন যেটায় হাল আমলের এমআই সিক্স এজেন্টের অনুপ্রবেশ করতেও রীতিমত ঘাম ছুটে যাবে।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
‘সান জু’ তার লিখিত ‘আর্ট অব ওয়ারে’ বলেছিলেন, “অজেয়তা নিহিত আছে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধে, এবং বিজয়ের সম্ভাবনা আছে আক্রমণে”। অর্থাৎ আক্রমণে জয়-পরাজয় সবই ঘটতে পারে। কিন্তু যে প্রতিরোধ সহজে ভেঙ্গে পড়েনা, সেটা সবসময়ই অজেয়। লিওনার্দো তার নিজের জীবনেও এই ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী। ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ কর্তৃক কন্সট্যান্টিনোপল দখল হবার আগের বছর তিনি জন্মেছিলেন। রেনেসাঁ যুগের যুদ্ধকৌশল এবং রাজনীতির প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। তিনি নিজ চোখে দেখেছেন এক মাইল দূর হতে ছোঁড়া সুলতান মাহমুদের কামানের গোলাগুলোর সামনে কীভাবে তথাকথিত দুর্ভেদ্য সব দুর্গ হুড়মুড় করে ধ্বসে পড়ে।


"মাত্র এক মাইল? এটার ছোঁড়া গোলা তো মঙ্গলে গিয়ে পড়ার কথা!"

“মাত্র এক মাইল? এটার ছোঁড়া গোলা তো মঙ্গলে গিয়ে পড়ার কথা!”




টার্কিশ কামানের সামনে যখন মধ্যযুগীয় দুর্গের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দফারফা হয়ে গেলো, তখন ভিঞ্চির মত সামরিক পরিকল্পনাবিদদের হাতে পড়লো এদের নিরাপত্তা বর্ধনের দায়িত্ব। অনেকেই অনেক রকমের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। যেমন- কেউ প্রস্তাব করলেন দুর্গের বাইরে চার-পাঁচ স্তরে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের। কেউবা বললেন শুধু চার-পাঁচ স্তরের দেয়াল বানালেই হবে না, সেগুলোকে আরো উঁচু করে বানাতে হবে- যাতে কামানের গোলা দুর্গের দেয়াল টপকে সরাসরি ভেতরে এসে আঘাত হানতে না পারে। কেউ কেউ আবার প্রস্তাব করেছিলেন- ভুয়া একটা দুর্গ বানিয়ে সেটার ভেতরে আরেকটা আসল দুর্গ বানাতে। দুই দুর্গের মাঝে হাজারে হাজারে তেলের ড্রাম রাখা হবে। যখন শত্রুরা ভুয়া দুর্গে ঢুকে পড়বে, তখন আসল দুর্গের প্রতিরক্ষাকারীরা সেসব তেলের ড্রামে আগুন ধরিয়ে দিবে- ইত্যাদি ইত্যাদি এমন আরো অনেক ধরনের পরিকল্পনা।


আমাদের বিজ্ঞানযাত্রা হতেও এমন একটা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হলো।

আমাদের বিজ্ঞানযাত্রা হতেও এমন একটা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হলো।




কিন্তু সব ধরণের পরিকল্পনাতেই বড় রকমের খুঁত ছিলো। চার-পাঁচ স্তরের দেয়াল দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী বানাতে গেলে দুর্গের চারপাশে বিশাল জায়গার প্রয়োজন হবে। অনেক সময় সেটা পাওয়া যাবে না। তাছাড়া আগেই বলেছি তুর্কিদের কামানের গোলা মাইল খানেক দৌড়াতে সক্ষম। তাতে ফলাফল কতটা আশাব্যঞ্জক হবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। আর তেলের ড্রাম থিওরিতে গেলে তো ফলাফল আরো ভয়াবহ। বাইরের শত্রুদের নকল দুর্গের ভেতর আটকে ফেলে চারপাশে আগুন ধরিয়ে দেয়া না হয় গেলো, কিন্তু ভেতরের আসল দুর্গের লোকদের পালানোর প্রয়োজন পড়লে তখন কি হবে? যদি অন্যান্য দুর্গের মত এটায়ও গোপন টানেল ধরেই পালাতে হয়, তাহলে দুর্গের এত নিরাপত্তার আর প্রয়োজন কী?

তাই ভিঞ্চি তৈরি করলেন তার নিজস্ব দুর্গের নকশা– যেটা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জায়গা দখল করে না, অন্যান্য দুর্গের কিংবা প্রাসাদের চেয়েও বেশী নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে (যেমন- প্রতিরক্ষাকারী কামান, তীরন্দাজ ইত্যাদির সুকৌশল অবস্থান গ্রহণ) সমর্থন করে এবং একই সময়ে এর দেয়াল কামানের গোলার তীব্র ধাক্কা হজম করতে পারে।

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
আপনারাই দেখুন আর বিচার করুন।

LeonardoFort3
যদি এটাকে হলিউডি সাই-ফাই মুভির দৃশ্য হতে উঠে আসা কোন ফিউচারিস্টিক স্থাপত্যকলার নিদর্শনের মত না মনে হয়, তাহলে বলবো আপনার আরো বেশী করে ‘স্টার ওয়ার্স’ মুভিগুলো দেখা উচিৎ (আধুনিক তিনটা প্রিকুয়েল বাদ দিয়ে। ওগুলো হচ্ছে পরিচালক জর্জ লুকাসের ‘স্টার ওয়ার্স’ সিরিজকে সম্ভ্রমহানি করার ফলে সৃষ্ট তিনটা অবৈধ সন্তান)। এটা যদি একজন বন্ড ভিলেনের নিখুঁত দুর্ভেদ্য আস্তানা না হয়, তবে আমাদেরও ধারণা নেই সেটা আর কীভাবে হতে পারে।

কামানের গোলার কার্যকারিতা কমাতে এক পর্যায়ে মধ্যযুগের বিভিন্ন দুর্গ এবং প্রাসাদের দেয়াল চক্রাকারে বানানো শুরু হয়েছিলো। এতে পুরোপুরি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। কিন্তু কামানের গোলার বিরুদ্ধে আরেকটু বেশী ঘাতসহ হয়ে উঠেছিলো এগুলো। ভিঞ্চি সেই ধারণাটাকেই আরো বহুদূর নিয়ে গিয়েছিলেন এই অতি ফিউচারিস্টিক এক স্থাপত্য নকশায়।

কিন্তু কথা হলো, সেই গোপন আস্তানায় আমাদের এই বন্ড ভিলেন কী এমন গোপন জিনিস তৈরি করবেন? অনেক কিছু, যেগুলো দিয়ে পুরো দুনিয়ার ক্ষমতা হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়। যেমন- প্রথমত বলা যায়……….

রোবট আর্মি


রোবটের ধারণাকে যত আধুনিক মনে করা হয় আসলে সেটা তত আধুনিক নয়। বরং খ্রিস্টের জন্মেরও ২৭০ বছর আগে গ্রীক প্রকৌশলী ‘টেসিবিয়াস’ মানবসভ্যতাকে রোবট সম্পর্কে ধারণা দেন। কিন্তু সেই রোবটকে আরো আধুনিকায়ন করে ‘ড্রোন আর্মি’ বানিয়ে তাদের যুদ্ধের ময়দানে ছেড়ে দেয়ার আইডিয়াতো সাম্প্রতিক কালের ঘটনা, ঠিক না? না, ভুল! আধুনিক মানুষদের মাথায় এই আইডিয়া আসার আরো বহু শতাব্দী পূর্বেই ভিঞ্চি এই ‘ড্রোন আর্মি’ বানানোর পরিকল্পনা করে গিয়েছিলেন।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
ইতালিয়ান সামরিক বাহিনী যে সব অপদার্থদের সমন্বয়ে গঠিত, এই তথ্য মধ্যযুগীয় দার্শনিক এবং রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ‘নিকোলো মাকিয়াভেল্লি’ এর চেয়ে ভালো আর কেউ জানতো না। তার ‘দ্যা ডিসকোর্সেস’ এবং ‘দ্যা প্রিন্স’ পুস্তকসমূহের জায়গায় জায়গায় তিনি মোটামুটি ঘুরেফিরে এই কথাই বলেছেন যে- ইউরোপের পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে তার নিজের সৈন্যদের কামান হতে ছোঁড়া গোলায় নিজেরাই ধরাশায়ী হয়ে। আধুনিক যুগেও ইতালির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাকিয়াভেল্লির এই বক্তব্য সমানভাবে প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ- ইতালি বনাম ইথিওপিয়ার যুদ্ধের ইতিহাসের দিকে তাকালেই হয়।

যাই হোক, এই ব্যাপারে সেই সময়ে ইতালির সমস্যা ছিলো দ্বিমুখী। প্রথমত, তখনো ইতালি একত্রিত হয়ে একটি সঙ্ঘবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে নিজস্ব ‘সঙ্ঘবদ্ধ’ সেনাবাহিনীও গড়ে উঠেনি। দ্বিতীয়ত, ইতালির ডিউক এবং যুবরাজেরা বহির্দেশের, বিশেষত সুইজারল্যান্ডের, ভাড়া করা সৈন্যদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। ইতালির অর্থ-সম্পদের এক বিশাল অংশই ব্যয় হতো এই ভাড়া করা সৈন্যবাহিনীর খরচ যোগাতে। কিন্তু তাতেও সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যাচ্ছিলো না। এই ভাড়া করা সৈন্যরা মাঝে মাঝেই মোটা টাকার বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিপরীত শিবিরে যোগ দিতো। তথ্য পাচার করতো।

এই সমস্যা মোকাবিলায় এগিয়ে এলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। তিনি মানুষের শরীরের পেশী এবং সেসব পেশীর চলনের নেপথ্যের সব মেকানিক্যাল প্রসেসগুলো নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ করতে লাগলেন বিভিন্ন চিত্রাঙ্কন সহকারে। এখনকার রোবটিক্সের জগতের দুর্ধর্ষ সব চিন্তাবিদেরাও স্বীকার করেন ভিঞ্চি ঠিক পথেই আগাচ্ছিলেন। তিনি প্রায় নিখুঁতভাবে উদ্ধার করেন মানবশরীরের বিভিন্ন পেশীর নড়ন-চড়নের পেছনের সব নেপথ্য কারিগরদের রহস্য। এরপরে কাজ ছিলো একটাই। যন্ত্রপাতির কলাকৌশল ব্যবহার করে সেই একই প্রক্রিয়াগুলো একটা যন্ত্রমানবের ভেতরে ঘটানো। তিনি এই লক্ষ্যে কিছু ডিজাইনও প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়কার প্রযুক্তিগত অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি তার ডিজাইনগুলোকে আর বাস্তবে রূপদান করতে সক্ষম হননি।
05_anatomist_fullsize
কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
ভিঞ্চির ডিজাইন করা রোবটেরা বর্তমান বাজারের ড্রয়েডদের থেকে যোজন যোজন দূরে ছিলো- একথা সত্যি। কিন্তু ভিঞ্চির চিন্তাধারা সঠিক পথেই চলছিলো এ ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তার রেখে যাওয়া ডিজাইন অনুসরণ করে বর্তমানে যে রোবট দাঁড় করানো হয়েছে, সেটা মানুষের মতই হাত-পা নাড়াতে এবং চলাফেরা করতে পারে।

Leonardo-Robot3
তার কাগজে অংকিত রোবটেরা বর্তমানের বদলে সেই আমলেই মানুষের মত চলতে ফিরতে সক্ষম হতো যদি তিনি তাদের চালাতে একটা নির্ভরযোগ্য শক্তির উৎসের সন্ধান পেতেন। যদি সেই আমলে বৈদ্যুতিক মোটর কিংবা নিদেনপক্ষে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ধারণাও চালু থাকতো, তাহলে বর্তমানের মানুষদের ‘স্কাইনেট’ এর শাসনাধীনে থাকাটাও বিচিত্র কিছু ছিলো না। তবে এটুকু অন্তত বলা যায়, মাকিয়াভেল্লিকে সেইসব মডেল রোবট আর বাস্তবের ইতালিয়ান সেনাবাহিনীর মধ্য হতে বাছাই করতে বললে তিনি পূর্বেরটাকেই সমর্থন দিতেন যুদ্ধের ময়দানে নামানোর জন্যে।

ট্যাংক


আধুনিক মানুষ তথা হোমো স্যাপিয়েন্সদের দুই লক্ষ বছরের মারামারি-কাটাকাটির ইতিহাসে ট্যাংক এক নব সংযোজন। ট্যাংককে বলা হয় যুদ্ধের ময়দানের রাজা। আর যুদ্ধ যদি না চলে, তবে অবসরে জনবসতিতে ট্যাংক নিয়ে ঢুকে পড়ে মানুষকে ভয় দেখানোর মত আনন্দেরও কোন তুলনা নেই। উপরের তিনটি বাক্যের মধ্যে একটা হচ্ছে আংশিক ভুল। কোনটা ধারণা করুন তো! যারা বলছেন “তৃতীয়” তাদের বলবো আপনারা জীবনে একবার হলেও ‘গ্র্যান্ড থেফট অটো’ খেলার চেষ্টা করে দেখুন, আর যাচাই করুন তৃতীয় বাক্যের সত্যতা (সেই সাথে উপরের ঐ বাক্যের লিংকগুলোও চেক করুন)। যারা বলছেন “প্রথম”, তারাই আসলে সঠিক। কিন্তু প্রথম বাক্যের কোন অংশটা মিথ্যা? “হোমো স্যাপিয়েন্সদের দুই লক্ষ বছরের মারামারি-কাটাকাটির ইতিহাস”?

না, তা নয়। ভুল হলো “ট্যাংক এক নব সংযোজন” এর অংশটা। ভিঞ্চি বহু শতাব্দী আগেই ট্যাংক আবিষ্কার করে গেছেন।

ভিঞ্চির মূল ডিজাইন
মানুষের অভ্যাসই হলো সব কিছুকে পোর্টেবল সাইজে নিয়ে আসা যাতে সে বস্তুটাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে পারে। সেটা আগের আমলের টু-ব্যান্ড রেডিও কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ারকে সস্তা চায়না মোবাইলের ভেতরে ঢুকিয়েই হোক, কিংবা জন সুবিধার্থে টয়লেট নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে বেড়ানোই হোক। আগের পয়েন্টে বর্ণিত মধ্যযুগীয় কামানগুলোও দেখা গেলো একই পরিণতির দিকে আগাচ্ছে। তারা দিনকে দিন পোর্টেবল সাইজের হয়ে যাচ্ছে, অথচ তাদের ক্ষমতা বাড়ছে বৈ কমছে না। কিন্তু একটা ব্যাপারে এগুলোর দুর্বলতা তখনো রয়ে গেছে। কামানগুলোকে যারা পরিচালনা করছে তাদের মেরে ফেললেই কামানগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।

ভিঞ্চি যথারীতি এগিয়ে এলেন তার মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে। তিনি কামানটাকে খোলের মত আবরণে ঢেকে ফেললেন। অনেকে হয়তো ভাবছে- এ আর এমন কী ব্যাপার? ‘ব্যাটারিং র‍্যাম’ এর ক্ষেত্রেও তো এমন করা হয়েছিলো। তাহলে আরেকটু পড়ুন। ভিঞ্চির ডিজাইন করা ট্যাংকগুলো ৩৬০ ডিগ্রীর পুরোটা জুড়েই কার্যকর ছিলো, যেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ট্যাংকের আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত আর কোথাও দেখা যায়নি।

KONICA MINOLTA DIGITAL CAMERA

কিন্তু মূল ঘটনা সেটাও নয়। ঘটনা হলো আপনি এটার ৩৬০ ডিগ্রী ফায়ারিং রেঞ্জের ভেতর দিয়ে কোনরকমে গা বাঁচিয়ে কাছাকাছি পৌঁছে ট্যাংকটার ঢাকনি উপড়ে ফেললেন, আর প্রস্তুতি নিলেন ভেতরে থাকা সবাইকে কচুকাটা করার। কিন্তু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলেন ভেতরে কেউ নেই, এটা নিজে নিজেই চলছে!

কতটুকু কার্যকরী ছিলো এই ডিজাইন?
লিওনার্দো যখন দেখলেন কামানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে এর পরিচালনাকারী ব্যক্তিরা, তিনি তখন তার ডিজাইনে সেই ব্যক্তিদেরই সরিয়ে দিলেন। ঘোড়ায় টেনে সরিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থাও স্বয়ংক্রিয় করে ফেলা হলো তার ডিজাইনে। গিয়ার-পুলি মেকানিজমের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করলেন যাতে এটা নিজে নিজেই ফায়ার করতে থাকে।

3786295193_49f3ce354f
আধুনিক যুদ্ধ-তত্ত্ব বিষয়ক গবেষণায় ভিঞ্চির এই ট্যাংকের ডিজাইনের অনেক ত্রুটি পাওয়া গেছে। তবে সামরিক কলা-কৌশল বিদেরা স্বীকার করেছেন ভিঞ্চির আইডিয়া হতেও আধুনিক যুগের ট্যাংক অনেক অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। কিন্তু পিলে চমকে উঠার ব্যাপার হলো, সম্প্রতি কালে ভিঞ্চির আরো কিছু গবেষণার নকশা খুঁজে পাওয়ায় বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন- পূর্বে ট্যাংকের ডিজাইনে খুঁজে পাওয়া ত্রুটিগুলো ছিলো আসলে ইচ্ছাকৃত ভাবে ঘটানো! ভিঞ্চি নিজেই তার ডিজাইনগুলো এইভাবে ত্রুটিযুক্ত করে রেখে গেছেন। তার মূল চেষ্টা ছিলো এইসব ডিজাইন অন্য কারো হাতে যাতে না পড়ে। আর পড়লেও যাতে সেটা হতে কোন সুবিধা আদায় করতে না পারে।

তাহলে কি সত্যি সত্যিই তার ডিজাইন করা মনুষ্যবিহীন মূল ট্যাংকগুলো নিখুঁত রকমের কার্যকর ছিলো  ।

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/vinci_as_bond_villain_01/

Thursday, August 15, 2019

ইগনাজ ফিলিপ সেমলভাইস – যাঁর বৈপ্লবিক আবিষ্কার মেনে নেয়নি মানুষ


মীনা কার্টুনের সেই পর্বটার কথা মনে আছে? মীনা আলাদিনের জাদুর চেরাগের থেকে দৈত্য বের করে আনে। পরে তার কাছে তিনটা ইচ্ছাপূরণের কথা প্রকাশ করে। সবাই যেখানে ধন-দৌলত, প্রাসাদ-অট্টালিকা চায়; সেখানে আমাদের মীনা চেয়েছিলো সবার জন্যে নিরাপদ পানি আর পরিচ্ছন্ন ভাবে হাত ধোয়ার সুব্যবস্থা। তার ইচ্ছার কথা শুনে চেরাগের জ্বিনের চোখ কপালে উঠে গিয়েছিলো। এতো দামী দামী জিনিস রেখে সে এসব চেয়ে বেড়াচ্ছে কেন? পাগল নাকি! যদিও পরে মাথা চুলকাতে চুলকাতে জ্বিন মীনার ইচ্ছাগুলো ঠিকই পূরণ করে দিয়েছিলো।

মীনাকে চেরাগের জ্বিন বোকা ভাবলেও ঘটনা অন্তত আর আগে না বেড়ে সেই পর্যন্তই ছিলো। কিন্তু ইতিহাসে এমন এক ব্যক্তি আছেন, যিনি মানুষজনকে হাত ধোয়ার কথা বলায় তাঁকে সবাই পাগল ঠাওরেছিলো। তাঁর হাত ধোয়ার পরামর্শে কান না দিয়ে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিলো। তাঁর চাকরি চলে গিয়েছিলো। শেষে তাঁকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিলো পাগল হয়ে যাবার অভিযোগে। আর তাঁকে নিয়ে ট্রল করার মাঝের সময়টাতে সঠিকভাবে হাত না ধোয়ার কারণে মারা গিয়েছিলো আরো বহু মানুষ। আমাদের আজকের লেখাটা সেই ব্যক্তিকে নিয়ে। তাঁর নাম ‘ইগনাজ ফিলিপ সেমলভাইস’। জন্মসূত্রে তিনি হাঙ্গেরিয়ান। তাঁকে ধরা হয় মেডিকেলে সার্জারিতে এন্টিসেপ্টিক পদ্ধতি অনুসরণের পথিকৃৎ হিসেবে।



১৮৫০ সাল নাগাদ ইউরোপে সন্তান জন্মদানের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক ছিলো না। সেখানকার চাইল্ড কেয়ার ক্লিনিকগুলোতে প্রায়ই Puerperal Fever নামক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটতো। এটাকে ‘চাইল্ডবেড ফিভার’ নামেও ডাকা হয়। সেই সময় যদি বাসাবাড়িতে ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হতো, তবে হাজারে হয়তো ৫ জন মা মারা যেতেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে হাসপাতালে এই মৃত্যুর হার ছিলো আরো বেশি। প্রায় ১০-১৫ গুণ! কিন্তু কেন, সেই প্রসঙ্গে একটু পরেই আসছি।

আমাদের আলোচ্য ব্যক্তি ইগনাজ সেমলভাইস ১৮৪৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এক জেনারেল হাসপাতালে প্রসূতি সেবা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর অধীনে দু’টো ওয়ার্ড ছিলো। একটায় প্রফেশনাল ডাক্তাররা সেবা দিতেন, আরেকটায় ধাত্রীবিদ্যা জানেন কিন্তু ডাক্তারি ডিগ্রি নেই, এমন সাধারণ মানুষজন সেবা দিতেন। এই হাসপাতালগুলো খোলা হয়েছিলো মূলত পরিবার ও সমাজ যেসব মা ও সন্তানের দায়ভার নিতে চায় না (যেমন – যৌনকর্মী), তাদের কথা স্মরণে রেখে। তা না হলে ঐসময়ে সাধারণত বাড়িতে ধাত্রী ডেকে এনেই সন্তান প্রসব করানো হতো। এখন এদের মধ্যে যাদের পকেটের অবস্থা ভালো, তারা প্রথম ওয়ার্ডে সেবা নিতেন। আর যাদের বাচ্চা জন্মদানের খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই, তারা যেতেন দ্বিতীয় ওয়ার্ডে।

কথা হলো, প্রথম ওয়ার্ডে রোগীদের চাইল্ডবেড ফিভারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার ছিলো ১০%। আর দ্বিতীয় ওয়ার্ডে এই মৃত্যুহার ছিলো ৪%। অর্থাৎ, যে ওয়ার্ডে প্রফেশনাল ডাক্তারেরা সেবা দিতেন, সেখানে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার ছিলো দুস্থ-গরীবদের জন্যে খোলা ওয়ার্ডের মৃত্যুহারের চেয়ে বেশি। সাধারণ ধাত্রীদের হাতে অনেক বেশি সংখ্যক শিশু সুস্থ শরীরে জন্ম নিয়ে মায়ের কোলে বাসায় ফিরে যাচ্ছিলো। প্র্যাক্টিক্যালি, প্রথম ওয়ার্ডে টাকা দিয়ে সন্তান প্রসব করানোর চেয়ে দ্বিতীয় ওয়ার্ডে বিনা পয়সায় সন্তান প্রসব করানো ভালো। আর সেটার থেকেও ভালো কোনো হাসপাতালে না গিয়ে রাস্তায় সন্তান প্রসব করালে!



“কি! হাসপাতালের দ্বিতীয় ওয়ার্ডে সিট খালি নাই!! ড্রাইভার সাব, আমাকে সাইডে চাপায়ে নামায় দ্যান। আমি রাস্তাতেই বাচ্চা প্রসব করাবো।”




যাই হোক, হাসপাতালের এই পরিসংখ্যানটা ঐ অঞ্চলের কমবেশি সকলেরই জানা ছিলো। ফলে সকলেই প্রফেশনাল ডাক্তারদের ওয়ার্ডে ভর্তি না হয়ে দ্বিতীয় ওয়ার্ডে ভর্তি হতে চাইতো। এতে করে এমেচার ধাত্রীদের সামনে পড়াশুনা জানা ডাক্তারদের ইজ্জতের ফালুদা হবার দশা হলো। ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব পেয়েই এই ব্যাপারটা নিয়ে কাজ শুরু করলেন সেমলভাইস। তাঁর নিজের ভাষ্যেই, “এই ব্যাপারটা এতো বেশি পীড়া দিচ্ছে যে, জীবনটাকে অর্থহীন মনে হচ্ছে।” তিনি দুই ওয়ার্ডকে পর্যবেক্ষণে রাখা শুরু করলেন। দুই ওয়ার্ডে যে সব ব্যাপারে পার্থক্য আছে, সেগুলো নোট করা শুরু করলেন।

এখন পর্যন্ত পার্থক্য এক জায়গাতেই। প্রথম ওয়ার্ডে প্রফেশনাল ডাক্তার, দ্বিতীয় ওয়ার্ডে সাধারণ ধাত্রীবিদ্যা জানা মানুষেরা। বেশি মানুষের জনসমাগমকে সেমলভাইস শুরুতেই বাদ দিয়ে দিলেন। কারণ দ্বিতীয় ওয়ার্ডে মানুষ বেশি ভর্তি হতে চাইতো। তাতে রোগীর সংখ্যা ছিলো অত্যধিক। কিন্তু মৃত্যুহার ছিলো ঐখানেই কম। সুতরাং এই পথে আগানো অর্থহীন। তাই তিনি অন্য সব দিকে পার্থক্য খুঁজে বেড়াতে শুরু করলেন। কিছুদিন বাদেই সেমলভাইস দেখলেন, প্রথম ওয়ার্ডে মায়েদের পিঠের উপরে ভর দিয়ে শুইয়ে সন্তান প্রসব করাচ্ছেন ডাক্তারেরা, যেখানে দ্বিতীয় ওয়ার্ডে ধাত্রীরা মায়েদের পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে সন্তান প্রসব করান। এটাই কি তবে কারণ হতে পারে? সেমলভাইস নির্দেশ দিলেন প্রথম ওয়ার্ডেও মায়েদের পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে সন্তান প্রসব করাতে। তাঁর কথা অনুযায়ী তাই শুরু করা হলো। কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে ফলাফল পাওয়া গেলো শূন্য। চাইল্ডবেড ফিভারে মৃত্যুহার সেই একই। পাশ ফিরে শোয়া না শোয়ার সাথে এই জ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য!

তার কিছুদিন বাদে আরেকটা ব্যাপার নজরে পড়লো সেমলভাইসের। যখন কোনো রোগী মারা যেতেন চাইল্ডবেড ফিভারে, তখন হাসপাতালের চার্চের একজন যাজক সেই রোগীর বেডের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন। তার পেছন পেছন একজন অ্যাটেনডেন্ট হাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে হাঁটতো। সেমলভাইস ভাবলেন, যাজককে দেখে এবং তার ঘণ্টার শব্দ শুনে রোগীরা কি আঁতকা ভয় পেয়ে উঠে নাকি, যাতে গায়ে জ্বর চলে আসে আর রোগী মারা যায়? কোনো কারণে প্রথম ওয়ার্ডে বেশি রোগী মারা যাওয়ায় যাজক বেশিবার এসেছিলেন ওখানে। তাকে দেখে এবং ঘণ্টার শব্দ শুনে আরো বেশি রোগী মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে চেইন রিঅ্যাকশনে আরো বেশি রোগী মারা গেছে। ব্যাপারটা কি এমন? এই সব আবোলতাবোল ভেবে তিনি যাজককে বললেন, রোগী মারা গেলে হাসপাতালের ভিতর দিয়ে তিনি যাতে অন্য পথ ধরে হাঁটেন। যাজক তাই শুরু করলেন। কিছুদিন পরে দেখা গেলো এতেও ফলাফল শূন্য। জ্বর আসা না আসার পেছনে যাজক এবং তার ঘণ্টার কোনো প্রভাব নেই। এই জ্বর পুরা নাস্তিক, যাজক এবং তার ঐশ্বরিক ঘণ্টার বাজনাকে ভয় পায় না!

এই পর্যায়ে সেমলভাইসের মেজাজ পুরো বিলা হয়ে গেলো। হতাশায় তিনি কিছুদিন ছুটি কাটাতে চাইলেন। ছুটি নিয়ে চলে গেলেন তিনি ভেনিসে। বেশ দীর্ঘ একটা ছুটি কাটিয়ে যখন তিনি হাসপাতালে ডিউটিতে ফিরলেন, তখন কানে এলো একটা দুঃসংবাদ। তাঁর এক কলিগ, যিনি ছিলেন প্যাথলজিস্ট, অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। জ্বর হয়েছিলো তার। ঐ সময়ে প্যাথলজিস্টদের জ্বরের ফলে মৃত্যু সংবাদ একটু বেশিই নিয়মিত ছিলো। প্যাথলজিস্ট সমাজের সদস্যদের জ্বরের কারণে মৃত্যুর খবর বেশ ঘনঘন পাওয়া যেতো। সেমলভাইসের কলিগ একটা লাশের অটোপসি করার সময়ে সুঁইয়ের খোঁচা খেয়েছিলেন আঙ্গুলে। এরপরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান।

সেমলভাইস তাঁর সেই কলিগের জ্বরের লক্ষণগুলো ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করলেন। করে দেখলেন, হাসপাতালের গর্ভবতী মায়েদের মতো তাঁর কলিগও ঠিক একই জ্বরে মারা গেছেন। এইটাই ছিলো পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যাওয়ার সূত্রপাত। সেমলভাইস হাইপোথিসিস দাঁড় করালেন যে, কেন প্রথম ওয়ার্ডে প্রফেশনাল ডাক্তারদের হাতে অনেক বেশি পরিমাণে রোগী মারা যাচ্ছে! কারণ প্রথম ওয়ার্ডের ডাক্তারেরা প্রায়ই লাশের অটোপসি করেন, যেটা দ্বিতীয় ওয়ার্ডের ধাত্রীদের করতে হয় না। তার মানে লাশের শরীরে এমন কিছু বিষাক্ত পদার্থ থাকতে পারে, যেগুলো অটোপসি করা ডাক্তারদের হাতে করে চলে যাচ্ছে মায়েদের শরীরের ভেতরে। পরে তাদের শরীরে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে আনছে জ্বর। তাতে মারা যাচ্ছেন মায়েরা। সেমলভাইস এই বিষাক্ত পদার্থগুলোর নাম দিলেন ‘Cadaverous Particles’ বা শব কণা। (বর্তমানে এই রোগের জন্যে দায়ী করা হয় ‘Group A hemolytic streptococcus’ জীবাণুদের)



Group A hemolytic streptococcus




তিনি নির্দেশনা জারি করলেন, ডাক্তারেরা যাতে ক্লোরিন দিয়ে ভালোমতো হাত এবং সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ধুয়ে তারপরে মায়েদের সন্তান প্রসব করান। এখন পর্যন্ত ক্লোরিন সেরা জীবাণুনাশকগুলোর মধ্যে একটা। কিন্তু সেমলভাইসের সময়ে তিনি কিংবা অন্য কোনো মানুষ জীবাণুর ব্যাপারে তেমন জানতেন না। সেমলভাইসের স্রেফ মনে হয়েছিলো, হাত থেকে লাশের গন্ধ দূর করতে ক্লোরিন বেশ ভালো এক পরিষ্কারক পদার্থ। তাই তিনি সবাইকে ক্লোরিন দিয়ে হাত এবং সার্জিকাল যন্ত্রপাতি ধোবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনা পালন শুরু হবার পরেই নাটকীয়ভাবে প্রথম ওয়ার্ডে রোগীদের মৃত্যুহার কমে গেলো।

কিন্তু ঘটনা প্যাঁচ লাগতে শুরু করলো অন্য দিক দিয়ে।

ঘটনার কারণ উপলব্ধি করে সকলের বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে যাবার বদলে ডাক্তারদের মেজাজ পুরো বিলা হয়ে গেলো। তাদের মনে হলো, যে ডাক্তারেরা জীবন বাঁচান তারাই রোগ ছড়িয়ে রোগীদের মারছেন, এমনটাই উপস্থাপন করা হচ্ছে জনসমাজে। ফলে সেমলভাইসের ধারণার বিপরীতে তীব্র প্রতিরোধ আসা শুরু করলো। ‘চার্লস ডেলুসেনা মেইগস’ নামের আরেক ডাক্তার ঘোষণা করলেন, কোনো ডাক্তার হাত ধুবে না। ডাক্তারেরা হচ্ছেন ভদ্রলোক। আর ভদ্রলোকদের হাতে ময়লা থাকে না।



“এই দেখেন! আমি জেন্টেলম্যান। আমার হাত আমি সবসময় বগলে ঢুকিয়ে রাখি। আমার হাতে কোনো ময়লা নাই।” – ডেলুসেনা মেইগ




মেইগসের গলার সুরে সুর মিলিয়ে এগিয়ে এলেন অন্য ডাক্তারেরাও। তারা কেউ হাত ধুবেন না। হাত না ধুয়েই তারা প্রসূতিদের সেবা দিবেন। ডাক্তারদের হাত ধোয়া মানে তারাই যে জ্বর ছড়াচ্ছে, সে কথা স্বীকার করে নেওয়া। এটা হতে দেয়া যাবে না। ডাক্তার মেইগের সাথে ‘জোহান ক্লাইন’ নামের আরেক ডাক্তার এসে যোগ দিলেন। এই দু’জনের তীব্র বিরোধিতার মুখে চাকরি চলে গেলো ডাক্তার সেমলভাইসের। তিনি ভিয়েনা ছেড়ে চলে গেলেন বুদাপেস্টে।

এরপরেও কয়েকবার তিনি বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরির জন্যে আবেদন করেছিলেন। তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিলো তাঁকে। ১৮৫১ সাল নাগাদ ‘যেইন্ট রোকুস’ হাসপাতালে বিনা বেতনে হেড ফিজিশিয়ানের দায়িত্ব নেন তিনি। সেখানেও ভীষণ চাইল্ডবেড ফিভারের সমস্যা ছিলো। সেমলভাইসের ক্লোরিন দিয়ে হাত ধোয়ার থেরাপিতে আশাতীত ফলাফল পাওয়া যায়। সেখানেও মায়েদের মৃত্যুহার হ্রাস পায়। তাঁর কাজের রিপোর্ট চলে যায় উপর মহলে। তারা যথারীতি খিক খিক করে হেসে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন সেই সব রিপোর্ট। কেউ মানতেই চাননি ডাক্তারদের হাতের মাধ্যমে প্রসূতি মায়েদের শরীরে জ্বর ছড়ানোর ব্যাপারটা।

কয়েকটা পেপারও লিখেছিলেন সেমলভাইস তাঁর আবিষ্কৃত এই ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু তাঁর পেপারের বিপরীতে পালটা পেপার লিখে হাত ধোয়ার ব্যাপারটাকে নাকচ করে দেন অনেকে। এর মধ্যে উপরে উল্লিখিত ডাক্তার ডেলুসেনা মেইগসও আছেন। পুরো ডাক্তার সমাজে হাসির পাত্র হয়ে উঠেন সেমলভাইস। ফেসবুক, ইন্টারনেট থাকলে হয়তো তাঁকে নিয়ে হাস্যকর সব মিম (Meme) বানানো হতো। বিভিন্ন পেইজে কুটি কুটি লাইক কামাতো সেই সব মিম (কারণ অধিকাংশ মানুষ বৈপ্লবিক চিন্তার বিপরীতে গিয়ে গতানুগতিক ধারায় থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তা সেটা যতই সত্য কথা হোক না কেন)।



“হাত ধুতেই থাকো, ধুতেই থাকো……”




এই বৈপ্লবিক আবিষ্কারের মাত্র এক যুগের মাথায় সেমলভাইস পুরো হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়লেন। নিয়মিত হারে যৌনকর্মীদের সাথে সময় কাটাতে শুরু করলেন। প্রায়ই মাতাল হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডাক্তারদের “কসাই, জানোয়ার, অশিক্ষিত গণ্ডমূর্খের দল” বলে গালাগাল করতেন। তাঁর পরিবারের লোকজনও তাঁর এই মেন্টাল ব্রেক ডাউনে অস্থির হয়ে পড়লো। তারা ১৮৬৫ সাল নাগাদ ভিয়েনার এক মানসিক হাসপাতালে চিঠি লিখলো সেমলভাইসের মানসিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে। সেই হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার ফার্দিনান্দ রিটার ভন হেবরা এসে সেমলভাইসের সাথে পরিচিত হলেন। তাঁকে ভিয়েনার মানসিক হাসপাতালটা ঘুরিয়ে দেখাবার জন্যে সাথে যাবার আমন্ত্রণ দিলেন। সেমলভাইস খুশি মনেই রওনা হলেন তার সাথে। ১৮৬৫ সালের ৩০ জুলাই উপস্থিত হলেন সেখানে। কিন্তু সেখানে নিয়েই আটকে ফেলা হলো তাঁকে। এরপরে শুরু হলো পাগলের চিকিৎসা, হাত-পা বেঁধে শক্ত করে মার দেয়া। হ্যাঁ, সেই আমলে ইউরোপের মানসিক হাসপাতালগুলো “মাইরের উপরে ভাইটামিন নাই” নীতিতেই চলতো।

মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়, ১৮৬৫ সালের ১৩ আগস্ট মারা যান সেমলভাইস। মারা যাবার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় শক্ত মারের কারণে শরীরে বেশি ভিটামিন ঢুকে যাওয়াকে (সারকাজম এলার্ট)! দু’দিন বাদে ১৫ আগস্ট সমাহিত করা হয় তাঁকে ভিয়েনাতে।

সেমলভাইসের ১৮৪৫ সালে আবিষ্কৃত হাত ধোয়ার ধারণা যে কতোটা যুগান্তকারী ছিলো, সেটা বুঝতে আরো বহু বছর সময় লেগেছিলো মানুষের। লুই পাস্তুর এবং তাঁর প্রকাশিত জার্ম থিওরিকে প্রয়োজন পড়েছিলো মানব সভ্যতার, বিশেষত ডাক্তারদের, সেমলভাইসের হাত ধোয়ার ধারণাটাকে হজম করতে। কিন্তু যতদিনে তারা উপলব্ধি করেছিলো সত্যটা, ততদিনে সেমলভাইসকে পাগল বানিয়ে দুনিয়া থেকে বিদেয় করে দেয়া হয়েছে। অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরিতে বর্তমানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় ডাক্তার সেমলভাইসকে। সেই সাথে তাঁকে অভিহিত করা হয় “Saviour of Mothers” নামে।



যেইন্ট রোকুস হাসপাতালের সামনে প্রতিস্থাপিত ডাঃ সেমলভাইসের মূর্তি


উৎস ঃ https://bigganjatra.org/ignaz_philipp_semmelweis/



Friday, August 2, 2019

কেমন গ্রহে প্রাণ থাকতে পারে?


নতুন একটা গবেষণা থেকে বলা হচ্ছে, আমাদের ছায়াপথ অর্থাৎ আকাশগঙ্গাতেই থাকতে পারে ১০ কোটি প্রাণসমৃদ্ধ গ্রহ। আজ থেকে কত কত বছর আগে, কার্ল সেগান তার “কসমস” বই আর টিভি সিরিজের মধ্যে একটা চমৎকার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন – চিন্তা করলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়! সম্প্রতি এ জাতীয় গবেষণাগুলো করা হচ্ছে আরো বর্ণনামূলকভাবে, আরো গাণিতিকভাবে। আসুন, আজ কিছু গবেষণার কথা জানি, কিছু মজার বিষয় শিখি।

Habitability Index


ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস, এল পাসো- এর শিক্ষক ডঃ লুইস আরউইন, তার কলিগদেরকে নিয়ে গ্রহগুলোর জন্য একটা ইনডেক্স তৈরি করেছেন। ইনডেক্সের মধ্যে ফ্যাক্টরগুলো হচ্ছে গ্রহের তাপমাত্রা, কক্ষপথ, বাহ্যিক ও রাসায়নিক গঠন, ইত্যাদি। ইনডেক্সের রেঞ্জ হচ্ছে শূন্য থেকে এক। এক মানে সেইরকম, শূন্য মানে “ম্যাহ”!

এই ইনডেক্স কোনো এলিয়েন অনেকদূর থেকে ফলো করলে পৃথিবী পাবে ০.৯৭, একের অনেক কাছাকাছি। ডঃ লুইস আরউইন কিন্তু পৃথিবীতে বসে একটা গ্রহকে একদম গোটা ১ দিয়ে ফেলেছেন, ওটার নাম Gliese 581c

Goldilock Zone


জীবনধারণের জন্য পানি লাগে, তাই গ্রহের অবস্থান হতে হবে এমন যাতে নক্ষত্রের বেশি কাছাকাছি না হয়, তাহলে পানি বাষ্প হয়ে যাবে। আবার যাতে বেশি দূরেও না হয়, নইলে পানি বরফ হয়ে যাবে। গ্রহকে থাকতে হবে একটা সুবিধাজনক “গোল্ডিলক জোন” এর মধ্যে। পৃথিবী, এমন একটি গ্রহ। এটা একটা ক্রাইটেরিয়া। এমন আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।

২০১৪ এর আগস্টে, দ্যা এস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারসে একটা আর্টিক্যাল ছাপা হয়েছিলো। সেখানে ফার্স্ট অথর জ্যাকলিন ফ্যাহারটি বলেছেন, মাত্র ৭ আলোকবর্ষ দূরে একটা ব্রাউন ডোয়ার্ফ গ্রহ পাওয়া গেছে। গ্রহটার near-infrared image আর্টিক্যালে দেখানো হয়েছে। এই আর্টিক্যালের abstract এর শেষ লাইনে বলা হচ্ছে, আমাদের সৌরজগতের বাইরে জলীয়বাষ্পের মেঘযুক্ত গ্রহের সরাসরি প্রমাণের জন্য এটাই প্রথম ক্যান্ডিডেট। এর আগে বায়ুমণ্ডলে পানির উপস্থিতি পাওয়া গেছে, কিন্তু পানির মেঘ এই প্রথম। চিলির লা কাম্পানা অবজার্ভেটরীর সাড়ে ৬ মিটার মেগেল্যান টেলেস্কোপ দিয়ে প্রাপ্ট ডেটা থেকে এই আর্টিক্যাল লেখা হয়েছিলো।

২০০৯ সাল থেকেই নাসা’র কেপলার স্পেস টেলিস্কোপ পৃথিবীর জমজ ভাই খুঁজে বেড়াচ্ছে সৌরজগতের বাইরে। ২৩ জন সায়েন্টিস এর এক টীম, এমনই এক গ্রহের আবিষ্কার নিয়ে একটা সায়েন্টিফিক আর্টিক্যাল পাবলিশ করেছিলেন ২০১৪ সালে।

গোল্ডিলক জোনের মধ্যে থাকলেই যে বসবাসযোগ্য হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর এটা ঠিক পৃথিবীর জমজ ভাই না, চাচাতো ভাই বলতে পারেন। আছে বেশ কিছু মিল, কিন্তু একদম এক বাপ-মায়ের সন্তান না, এই আর কী!

গোল্ডিলক জোনের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া আরেকটা গ্রহ হচ্ছে কেপলার ১০-সি। বিজ্ঞানীরা এটাকে আদর করে ডাকছেন গডজিলা প্ল্যানেট। কারণ, এর ব্যস ২৯,০০০ কিলোমিটার, পৃথিবীর চেয়ে ২.৩ গুণ বেশি। এটা পৃথিবীর চেয়ে ১৭ গুণ ভারী। এটা যে নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে, সেটা বিগ ব্যাং এর মাত্র ৩ বিলিয়ন বছর পরেই তৈরি হয়েছিলো। অর্থাৎ, বিজ্ঞানীরা এখন অনেক পুরনো নক্ষত্রের সোলার সিস্টেমের মধ্যেও বাসযোগ্য গ্রহ বা প্রাণের সন্ধান চালাতে পারেন।

আমাদের সূর্যের বেশ কাছাকাছি আছে আরেকটা নক্ষত্র, আলফা সেন্টোরী বি। এবং তার দখলে আছে একটা বাসস্থান হিসেবে চরম একটা গ্রহ, এইরকম একটা সম্ভাবনার কথা বলছেন গবেষকরা। নিচের ছবিতে এদের রিলেটিভ সাইজ দেয়া আছে।


01. Science

Image Source – http://bit.ly/1hezNd0




পৃথিবীর মত দ্বীপ, অগভীর সাগর, মোটামুটি সমতল ঢাল আছে, এমন গ্রহকে বলে সুপারহ্যাবিটেবল প্ল্যানেট। আলফা-সেন্টোরি বি এর দখলে থাকা গ্রহটা এমন এক সুপারহ্যাবিটেবল প্ল্যানেট। এই নতুন গ্রহের এমন সবকিছুই থাকার কথা, যেখানে প্রাণধারণ সম্ভব। শুধু সমস্যা একটা, এটার অভিকর্ষ এক চতুর্থাংশ বেশি হবে। হলো না হয়, সমস্যা নেই……… আরো ডিটেইলস ভালোভাবে পাওয়া গেলে জটিল হতো! বিজ্ঞানীরা সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৭ সালে, নাসা TESS নামে একটা স্যাটেলাইট ছাড়ার প্ল্যান করছে যার কাজই হবে গ্রহ সন্ধান করা। এটা আমাদেরকে সৌরজগতের বাইরের এই এক্সোপ্ল্যানেটগুলোর আকার, ভর, বায়ুমণ্ডল নিয়ে আরো ভালো তথ্য দিতে পারবে। ২০১৬ সালে, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ চালু করা হবে। নাসার মতে, এটা আমাদেরকে অন্য গ্রহের রঙ, ঋতু, আবহাওয়া, এমনকি উদ্ভিদের উপস্থিতির ব্যাপারেও অভাবনীয় তথ্য দিতে পারবে।

২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত, কেপলার মিশনের মাধ্যমে আবিষ্কৃত যেসব গ্রহকে পৃথিবীর মাসতুতো ভাই বলা হচ্ছে, তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪,৬৯৬টিতে। এগুলোতে প্রাণ সত্যিই আছে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, “আমরা এখনো ওদের কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাইনি”……… দেখি কোনো দিন পাই কিনা।

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/possible_habitable_planets/

Tuesday, July 2, 2019

মহাকালের কথা


– ১ : শুরু –


বয়স কতো তোমার? ৫ বছর, ১০ বছর, ১৮, নাকি ২০ পেরিয়ে আরো সামনে এগিয়ে চলেছো? ক্লাসে অংক করতে গিয়ে এমন অংক কি করেছো কখনো, যেখানে বয়েসের অনুপাত বের করতে হয়? কিংবা তোমার বয়েসের সাথে তোমার দাদুর বয়েসের অনুপাত কত, এমন কিছু?

হ্যাঁ, এমনসব অংকে একটা হিসেব এইরকম যে,
ধরো তোমার দাদু যদি হয় ৮০ বছরের, আর তুমি যদি ১০ বছরের হও তবে দাদুর বয়েসের ৮ভাগের ১ ভাগ হচ্ছে তোমার বয়েস। তাহলে জন্ম থেকে এখন অব্দি তোমার পুরো জীবনকে ৮বার পাশাপাশি রেখে যোগ করলে তবেই দাদুর বয়েস পাবে।

দেখা যাচ্ছে তোমার দাদু তোমার থেকে বয়েসে অনেক বড়ো আর পুরনো। বাব্বাহ্‌! সে তো অনেক বছর…
তোমার দাদুর থেকে আরও পুরনো কিছু আছে কি? তোমাদের বাড়িটি কদ্দিনের পুরনো? ১০, ৫০, নাকি ১০০ বছর, নাকি তারও বেশি; সে তো বহুকাল। আমার এই ২০ বছরের জীবন যেন সেখানে সামান্য!

এবার মনে করো যে, যা তুমি দেখ নি, তা কেমন ছিল, তা কি তুমি বলতে পারবে? যেমন ধরো তা কতো বছরের পুরনো, এমনকিছু?

হুম্‌… বলা যায় বৈকি। জঙ্গলে যারা কাঠ কাটতে যায় তারা কাদার মধ্যে বাঘের পায়ের ছাপ দেখে বলে দেয়, বাঘটি কখন এখান দিয়ে গিয়েছে, কোন দিকে গিয়েছে, এটি পুরুষ নাকি মেয়ে, ছোট নাকি বড়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে দেখা গেল যে, কিছু চিহ্ন ভালো করে ঘেঁটে দেখলে নানান সব তথ্য বেরিয়ে আসে, এমনকি সময়ের তথ্যও বেরিয়ে আসে।

যদি তুমি এসব তথ্য বের করার কিছু ব্যাপার জানতে পারো তবে তুমিও নানান জিনিসের বয়স বের করতে পারবে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা যারা পুরনো সব জিনিস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন তারা এসব জানেন। তাই তারা হাজার বছরের পুরনো বাড়ি খুঁজে পান। যেখানে অনেক আগের দিনের মানুষ দিন কাটাতো।

কিন্তু এই যে আমাদের চারপাশের যা কিছু তার মধ্যে সব থেকে পুরাতন ঘটনা কোনটি?

ঐ যে বলেছি কিছু চিহ্ন দেখে বলে দেয়া যায় যে, জিনিস কতো পুরনো, কিংবা ঘটনা কতো আগে ঘটেছে। তেমন ভাবেই আমরা জেনেছি আমাদের পৃথিবীর বয়স, আমাদের সবথেকে কাছের নক্ষত্র সূর্যের বয়স। আমাদের সৌর জগতের বয়স, ছায়াপথ আর সব সব কিছুর বয়স। সর্বোপরি আমাদের মহাবিশ্বের বয়স জেনেছি।

কিন্তু সে কতো কাল আগের কথা, সেই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে কে ছিলো তখন? না কেউ ছিলো না। তবে এ সম্পর্কে জানার উপায়টা হচ্ছে আমাদের আশপাশকে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ আর এক যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ক্রমিক পুঙ্খানুপুঙ্খ কার্যপদ্ধতি, যাকে আমরা বলি বৈজ্ঞানিক কার্যপদ্ধতি।

তো এভাবে গবেষণা করে আমরা জেনেছি যে, পৃথিবী ৪৫০,০০,০০,০০০ (সাড়ে চারশ কোটি) বছরের পুরনো।

আমরা আকাশের সবথেকে দূরতম উজ্জ্বল জিনিসের থেকে আসা আলোর বর্ণালীকে নিরীক্ষণ করেছি। আর তরঙ্গের নানান পরীক্ষণে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, মহাবিশ্বের শুরুটা হয় আজ থেকে ১৩৮০,০০,০০,০০০ (এক হাজার তিনশ আশি কোটি) বছর আগে। তো সময়ের সেই পথ-চলা থেকে এখন অব্দি নানান ঘটনার সমারহ জমে উঠেছে। এতো এতো ঘটনাকে একবারে বোঝানো এক বড্ড চ্যালেঞ্জের ব্যাপার বৈকি!

তবে এর এক চমৎকার সমাধান আছে।

মনে কর তুমি তোমার গ্রাম বা মহল্লার নকশাটি কাগজে আঁকবে, তো সেই নকশা আঁকতে তোমার এলাকার সমান বড়ো বিশাল এক কাগজ না এনে তুমি তোমার খাতার পৃষ্ঠাতেই তা আঁকতে পারো। সেক্ষেত্রে তোমাকে কিছু অনুপাত ধরে নিতে হবে। যেমনঃ পৃষ্ঠার এক ইঞ্চি = ২০ মিটারকে বোঝাবে, এরকম।

চেষ্টা করলে আমরা মহাবিশ্বের শুরুর সময় থেকে এই পুরো এক হাজার তিনশ আশি কোটি বছরকেও স্বল্প সময়ের অনুপাতে বোঝাতে পারি। যেমন ধরো ১ বছর = ১৩৮০,০০,০০,০০০বছর।

কিন্তু এটা কি ভেবে দেখেছো যে, যদি আমরা সময়ের এমন অনুপাতে সকল ঘটনাকে সাজাই তবে তোমার আমার জীবনের সময় সেখানে কতোখানি হবে? এই হিসেব করার আগে চলো আমাদের সেই মহাজাগতিক ১ বছরের অনুপাত অনুসারে এর দিন, ঘণ্টা, মিনিট সব সাজিয়ে নেয়া যাকঃ

১ মহাজাগতিক বছর = ১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর।

১ মাস = (১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর ÷ ১২ মাস=) ১১৫,০০,০০,০০০ বছর।

১ দিন = (১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর ÷ ৩৬৫ দিন=) ৩,৭৮,০৮,২২০ বছর প্রায়।
গণনার সুবিধার্থে আমরা ধরে নিচ্ছি ৩,৭৮,০০,০০০ বছর প্রতি দিনে।

১ সপ্তাহ = (৩,৭৮,০৮,২২০ বছর × ৭ দিন=) ২৬,৪৬,৫৭,৫৩৪ বছর প্রায়।

১ ঘণ্টা = (১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর ÷ ৮,৭৬০ ঘণ্টা প্রতি বছরে=) ১৫,৭৫,৩৪২ বছর প্রায়।
আমরা ধরে নিচ্ছি ১৫,৮০,০০০ বছর প্রতি ঘন্টাতে।

১ মিনিট = (১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর ÷ ৫,২৫,৬০০ মিনিট প্রতি বছরে=) ২৬,২৫৬ বছর প্রায়।
আমরা ধরে নিচ্ছি ৩০,০০০ বছর প্রতি মিনিটে।

১ সেকেন্ড = (১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর ÷ ৩,১৫,৩৬,০০০ সেকেন্ড প্রতি বছরে=) ৪৩৮ বছর প্রায়।
আমরা ধরে নিচ্ছি ৫০০ বছর প্রতি সেকেন্ডে।

আচ্ছা বেশ, তো ধরি তোমার বয়স ২০ বছর, আর মহাবিশ্বের বয়স ১৩৮০,০০,০০,০০০ বছর।
১ সেকেন্ডকে ৫০০ বছর ধরলে তোমার বয়স এক সেকেন্ডের ২৫ ভাগের ১ ভাগ বা মহাবিশ্বের বয়েসের একশ ভাগের ০.০০০০০০১৪৪৯২৭৫৪ ভাগ (% বা শতাংশ)।
ভাবো একবার ……
তোমার চোখের পলক ফেলতে কতোটুকু সময় লাগে, তা জানো? ১ সেকেন্ডের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ সময়। তার মানে আমাদের সাজানো মহাজাগতিক বছরে দাঁড়িয়ে তোমার চোখের এক পলকে ১০০ বছর। মানুষ জন্মায়, বড়ো হয়, বিয়ে করে, সুখ-দুঃখের ভেলায় ভেসে সংসার করে আর টুপ করে মরে যায় চক্ষের পলকে। তুচ্ছ জীবন। ক্ষণিকের!

– ২ : মহাজাগতিক পঞ্জিকা –


না, আমরা অংক করতে বসি নি…
আমরা মহাকালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের এক ঝলক দেখতে চলেছি। এতক্ষণ যা তুমি জানলে, এই হচ্ছে মহাকাল, যাকে মহাসমুদ্রের সাথে তুলনা করা যায়।

সময়ের গতিকে একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলে আমরা বছর-মাস-দিন… এসবের হিসেব করি। মাঝে মাঝে একটি নির্দিষ্ট অতিক্রান্ত সময়কে আলাদা নাম দিয়ে তাকে উদযাপন করি। ঠিক যেমন আমরা একটি নির্দিষ্ট অতিক্রান্ত সময়কে বছর ধরি। আর তোমার জন্মের পর থেকে বারবার একটি নির্দিষ্ট তারিখকে তোমার জন্মদিন বলে তোমরা বাড়ির লোকেরা সকলে মিলে উদযাপন করো আর কেক ছোঁড়াছুঁড়ি হয়।

কিন্তু মহাকাল!
সে তো অকুল মহা সমুদ্র!
এক শতাব্দী সেখানে হয়তো, শিশিরের মত ক্ষুদ্র!
তবুও সে শিশির কণা হয় হাসি-কান্না-অশ্রুশিক্ত –প্রাপ্তির…।

আমাদের মহাজাগতিক ১ বছরকে একটা নাম দেয়া যাক। জ্যোতিঃপদার্থবিদ Carl Edward Sagan (কার্ল এডওয়ার্ড সেগান) প্রথম এরকম একটা ধারণা তার বিখ্যাত বই The Dragons of Eden (দ্য ড্রাগনস অব ইডেন) এবং টেলিভিশিন সিরিজ Cosmos: A Personal Voyage (কসমস: অ্যা পারসোনাল ভয়াজ)-এ প্রকাশ করেন। ইনি এরকম মহাজাগতিক বর্ষপঞ্জিকে কসমিক ক্যালেন্ডার (Cosmic Calendar) নাম দেন।
আমরা নাম দিলাম- মহাজাগতিক পঞ্জিকা।

পৃথিবী-মহাশূন্য আর মহাবিশ্ব এর সব সবকিছুর শুরুটা হয়েছিলো এক মুহুর্তের মধ্য দিয়ে, যাকে বলা হয় The Big Bang (বিগ ব্যাং)। মানে হচ্ছে এক বৃহৎ বিস্ফোরণ। তো এই Big Bang দিয়েই জানুয়ারির ১ম দিনে আমাদের কসমিক ক্যালেন্ডার শুরু হলো।

সব কিছুর শুরু এখান থেকেই, আমাদের জানা অদ্যাবধি সকল ইতিহাস পুরো বছর জুড়ে সাজানো থাকবে, আর এ ক্যালেন্ডারের ৩১শে ডিসেম্বরের মধ্যরাতের শেষ মুহুর্তটি বর্তমান সময়কে বোঝাবে, যেখানে তুমি আমি আমরা সকলে আছি। তো এবার অতীতের পরম সূচনা লগ্নে, সেই প্রথম ক্ষণটিতে যাওয়া যাক।


– ৩ : জানুয়ারির দিনগুলো –


১লা জানুয়ারি, রাত ১২টা, প্রথম সেকেন্ড, প্রথম মুহুর্ত
আজ থেকে ১৩৮০,০০,০০,০০০ (এক হাজার তিনশ আশি কোটি) বছর আগে, The Big Bang.


Cosmic Background Radiation দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এই মূহূর্তটা হচ্ছে আমাদের জানা সবচেয়ে সুদূর অতীত। আমাদের সমগ্র মহাবিশ্বের উদ্ভব একটি ক্ষুদ্র পরমাণুর মত বিন্দু থেকে, যাকে সুপার এটম বলা হয়। তখনই শুরু হলো Time (কাল) এবং Space (স্থান)। এই মহাজাগতিক অগ্নিগর্ভ থেকে বিস্ফোরণ শুরু হলো, মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে থাকলো, তৈরি হতে শুরু করলো সকল শক্তি আর পদার্থ।



আমি জানি যে, এটা উদ্ভট শোনাচ্ছে, কিন্তু এর পেছনে বেশ দৃঢ় পর্যবেক্ষণলব্ধ প্রমাণাদি আছে যা বৃহৎ বিস্ফোরণের পক্ষে সমর্থন যোগায়। আর এই প্রমাণাদির মধ্যে আছে মহাবিশ্বের হিলিয়ামের পরিমাণ এবং রেডিও তরঙ্গের সেই শব্দ আর তেজ যা বিস্ফোরণের অবশিষ্টাংশ হয়ে এখনো রয়ে গেছে।



যাই হোক, প্রসারিত হতে হতে মহাবিশ্ব আস্তে আস্তে শীতল হতে থাকলো। প্রথম ২০ কোটি বছর কেবলই অন্ধকার ছিলো। অভিকর্ষের ফলে গ্যাসগুলো স্থানে স্থানে ঘন হচ্ছিলো, আর উত্তপ্ত হচ্ছিলো। তারপর একদিন, প্রথম নক্ষত্র তার আলোকের ঝলক নিয়ে উপস্থিত হলো, জানুয়ারির ১০ তারিখে।

১৩ই জানুয়ারিতে, এই নক্ষত্রগুলো একটা কলোনীর মত জোট বাঁধতে শুরু করলো, আর তার মাধ্যমেই তৈরি হলো প্রথম দিকের ছোটো ছোটো ছায়াপথ। প্রবল টানে এ ছায়াপথগুলো পরস্পরের সাথে ধাক্কা খেলো আর মিলে যেতে থাকলো যতক্ষণ না পর্যন্ত সুবিশাল কিছু একটা তৈরি হচ্ছে, আর সেই সুবিশাল জিনিসগুলোর মধ্যে আমাদের এই আকাশ-গঙ্গা (Milky Way Galaxy) ছায়াপথটিও আছে।

– ৪ : লক্ষ কোটি তারার মেলা –


১৫ই মার্চ , আজ থেকে প্রায় ১১০০,০০,০০,০০০(১১শ কোটি) বছর আগে ,

আমাদের আকাশ-গঙ্গা ছায়াপথ দৃশ্যমান হতে থাকে। এইসব সুবিশাল ছায়াপথে লক্ষ কোটি তারার মেলা। এর মধ্যে আমাদের সূর্য কোনটা? না, সে এখনো জন্মায় নি। সে পরে অন্যসব নক্ষত্রের ছাইয়ের গর্ভ থেকে জেগে উঠবে।
সেই জমাট গ্যাস-ধুলার মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মতো আলোর ঝিলিক দেখা যেতে লাগলো। এর একেকটা সুপারনোভা, একেকটা দানবীয় নক্ষত্রের মৃত্যুর প্রবল ঝলক। যে নক্ষত্রের মৃত্যু হল তা আবার জন্মাবে ঠিক এমনই এক স্থানে।

এ হচ্ছে নক্ষত্রের আঁতুড়ঘর।



মৃত নক্ষত্রের গ্যাস আর ছাই-ধুলোর দানবীয় মেঘপুঞ্জ থেকে নক্ষত্রগুলো অনেকটা বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঘনীভূত হতে থাকে। এগুলো এখন এতোটাই উত্তপ্ত যে, পরমাণুগুলোর মধ্যকার Nuclei (নিউক্লিয়াস বা মূল কেন্দ্রস্থল) একে অন্যের সাথে একদম গভীরভাবে গলে মিশে গেলো আর তৈরি করলো আমাদের নিঃশ্বাসের উপযোগী অক্সিজেন, আমাদের পেশীর মধ্যে থাকা কার্বন, আমাদের হাড়ে থাকা ক্যালসিয়াম, আমাদের রক্তে থাকা লৌহ, ইত্যাদি। অর্থাৎ, তোমার শরীরের সব কিছু আগে থেকেই রান্না করা হয়েছিলো অতীতের ধ্বংস হয়ে যাওয়া নক্ষত্রগুলোর অন্তঃস্থলে।

তুমি, আমি, আমরা প্রত্যেকে– নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে গড়া।

তাই সেগান বলেছিলেন, “We are star stuff.”

নক্ষত্রের এই ধ্বংসাবশেষ ঘুরেফিরে প্রক্রিয়াজাত আর সমৃদ্ধ হতে থাকলো বারংবার, আর সৃষ্টি-ধ্বংস-পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় জন্ম জন্মান্তর ধরে তা আমাদের কাছে বয়ে এলো।

আমাদের সূর্যের জন্ম লগ্ন আর কতো দূর? সে এক দীর্ঘ সময়। সে আরো ৬শ কোটি বছর ধরে অনুজ্জ্বল রয়ে যাবে।

– ৫ : আমাদের ঠিকানা –


৩১শে আগষ্ট , আজ থেকে প্রায় ৪৫৭,০০,০০,০০০ (৪শ ৫৭কোটি) বছর আগে ,

আমাদের সূর্যের জন্ম হলো। পৃথিবী, চন্দ্র সহ অন্যান্য গ্রহগুলো ঠিক পরপরই গঠিত হলো।

আমাদের সৌরজগতের আর সব কিছুর মতই পৃথিবীর গঠন হলো গ্যাস-ধুলোর এক চাকতি থেকে। আর ওরা সবাই নবীন সূর্যের চারপাশের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করতে থাকলো। বারংবার আঘাত আর সংঘর্ষে ধ্বংসস্তুপ দিয়ে তৈরি গোলকের আকার বৃদ্ধি পেতে থাকলো। এই সময়, এর প্রথম ১শ কোটি বছরে পৃথিবী খেলো এক প্রচণ্ড ধাক্কা। ধাক্কাটি ছিলো এক বিশাল গোল আগন্তুকের সাথে।



ধাক্কার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের টুকরোগুলো কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে ধাক্কা খেলো আর জমাত বাঁধতে থাকলো, যতক্ষণ না পর্যন্ত চাঁদ গঠনের জন্য এক গোলক গঠিত হচ্ছে। চাঁদ হচ্ছে এমন বহু বহু পাথরের সংঘর্ষ আর দৌরাত্ম্যের যুগের এক যথাযথ সাক্ষী আর ভুক্তভোগী।

যদি তুমি বহুকাল আগের সেই পৃথিবীতে দাঁড়াতে, আর যদি চাঁদের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ওর দিকে মনের কাব্যিকতা মাখানো দৃষ্টি দিয়ে চাইতে, তবে তখনকার চাঁদ তার শত শত গুণ বেশি ঔজ্জ্বল্য দিয়ে তোমার সাধের কাব্যরসকে শুকিয়ে ফেলতে সিকিটুকুও কার্পণ্য করতো না।

বর্তমানে চাঁদটা পৃথিবীর যতো কাছে, তার চেয়ে ১০ভাগের ১ভাগ পরিমাণ কাছে ছিলো তখন। পরম ঘনিষ্ঠতার অভিকর্ষের টানে পৃথিবী তার নবীন চাঁদকে নিজের কাছাকাছি রেখেছিলো।

পৃথিবী ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হতে থাকলো, সাগর জেগে উঠতে লাগলো। তখন ঢেউগুলো ছিলো হাজারো গুণ বেশি উঁচু। যুগযুগান্তর ধরে চাঁদ পৃথিবীর সাগরের বুকে জোয়ার-ভাটার লীলাখেলা চালালো; আর সাথে সাথে পৃথিবী চাঁদকে দূরেও ঠেলে দিতে থাকলো।

”অপরিণত শৈশব”এ পৃথিবী ছিলো উত্তপ্ত, গলিত আর এক বিষাক্ত জায়গা যেখানে আমাদের চেনাজানা মনোরম পরিবেশ বলে কিচ্ছুটি নেই। ধরিত্রী যতোই শীতল হয়, এই প্রথম কোনোকিছু জমাট বেঁধে প্রথম পাথর গঠন করতে শুরু করলো অক্টোবরের ২য় দিনে
বর্তমানে পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে পুরাতন পাথরের বয়স ৪০০,০০,০০,০০০(৪শ কোটি বছর), যা মহাজাগতিক পঞ্জিকার ১৬ই সেপ্টেম্বরে গঠিত হয়।

– ৬ : প্রাণের কথা –


এবার সময় প্রাণের উদ্ভবের!





২১শে সেপ্টেম্বর , আজ থেকে প্রায় ৩৮০,০০,০০,০০০ (৩শ ৮০কোটি) বছর আগে,
আমাদের এই ক্ষুদ্র দুনিয়ায় প্রাণের উদ্ভব হয় ।
প্রথম জীবন (প্রোক্যারিওট-Prokaryotes).

মহাসাগরের অতলে কোনো লাভা-টিউবের থেকে নির্গত ছাই-লাভা-ক্যামিক্যালের সাথে সমুদ্রের পানি জায়গায় জায়গায় ক্যামিক্যালের-সুপের মত হয়ে ওঠে। হয়তো সেখান থেকেই প্রাণ তার যাত্রা শুরু করে।
তবে আমরা এখনো সঠিক জানি না কীভাবে প্রাণ তার যাত্রা শুরু করেছিলো। আমরা যদ্দূর জেনেছি, হয়তো এটা এই আকাশ-গঙ্গা ছায়াপথেরই অন্য কোনো অংশ থেকে এসে থাকবে।
প্রাণের উৎপত্তি (The Origin of Life) বিজ্ঞানের সব থেকে বড়ো অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি।

তো এভাবেই বিকশিত হতে থাকে জলের মধ্যে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক প্রাণ। আর এর নানান ধরণের জৈব-রাসায়নিক উপাদানগুলো প্রস্তুত হতে থাকে পরবর্তীতে সবচেয়ে জটিল সব কর্মকাণ্ডের জন্য।

আমাদের জানা সবচেয়ে পুরাতন জীবাশ্মগুলো কিন্তু এখনকার ব্যাকটেরিয়া আর নীল-সবুজ শৈবালের চেয়ে খুব বেশি একটা জটিল ছিলোনা। সেই জীবাশ্মগুলো হাজির হতে থাকলো আমাদের পঞ্জিকার অক্টোবরের ৯ তারিখে। এই প্রাথমিক জীব-গঠন পুনরুৎপাদিত হলো থাকে নিজেকে বিভাজন করতে সক্ষম কোষের দ্বারা। যৌন প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্তার কিন্তু নভেম্বরের ১ তারিখের আগে আসেনি।

যাই হোক, ১২ অক্টোবর , আজ থেকে প্রায় ৩০০,০০,০০,০০০ (৩শ কোটি) বছর আগে, একদম প্রাথমিক পর্যায়ের সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করতে সক্ষম উদ্ভিদের জন্ম হলো।

২৯ অক্টোবর , প্রায় ২৪০,০০,০০,০০০ (২শ ৪০কোটি) বছর আগে, বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন যুক্ত হতে শুরু করে।

নভেম্বরের ৮ তারিখ, প্রাণ শ্বাস নিতে করতে শুরু করে, নড়তে শুরু করে, খেতে শুরু করে, আর পারিপার্শ্বিকতায় সাড়া দিতে শুরু করে। এই প্রাথমিক পর্যায়ের অণুজীবদের কাছে আমরা অনেক ঋণী।
আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা। এরা বংশ বিস্তারের উপায় হিসেবে প্রথমবারের মতো যৌনতাকে বেছে নিয়েছিলো।

৯ নভেম্বর , প্রায় ২০০,০০,০০,০০০ (২শ কোটি) বছর আগে,
জটিল কোষ (ইউক্যারিয়ট-eukaryotes) .
Nuclei আর eukaryotes নিয়ে প্রথম দিক্‌কার কোষ হাজির হয় এবং অবিলম্বেই এরা বিকশিত হতে শুরু করে ।

– ৭ : ডিসেম্বরে ঘটনার ঘনঘটা –


ডিসেম্বর মাস

আমাদের ক্যালেন্ডারের ডিসেম্বর মাসটি সবথেকে ব্যাস্ত মাস , এতোটাই ব্যাস্ত আর গাদাগাদি যে এ মাসটিকে দিনে দিনে ভাগ করে বোঝাতে হবে । এবার এমন ঘটনা ঘটতে চলেছে যা পৃথিবীর গতি বাড়িয়ে দেবে , আর তা হচ্ছে সবথেকে গুরুত্বপুর্ন এই অক্সিজেনের আবির্ভাব । অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে জায়গা নিতে থাকে , আর পৃথিবী প্রাণের জন্য আরো অনুকূল হতে থাকে ডিসেম্বরের ১ম দিনটিথেকে ।



৫ ডিসেম্বর, আজ থেকে প্রায় ১০০,০০,০০,০০০ (১শ কোটি) বছরআগে ,
প্রথম বহুকোষী জীবনের আবির্ভাব হয়।
বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনকে সাথে নিয়ে জীবন বিকশিত হতে থাকে একদম জোর কদমে।

প্রথম কেঁচো উপস্থিত হয় ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে।

১৪ ডিসেম্বর , প্রায় ৬৭,০০,০০,০০০ (৬৭ কোটি) বছরআগে সরল প্রাণীরা ব্যপক হারে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে।



প্রায় ৫৫,০০,০০,০০০ (৫৫ কোটি) বছর আগে আর্থ্রোপোডা, পোকামাকড়দের পূর্বপুরুষ, Arachnids – এরা বিকশিত হতে থাকে।

১৭ ডিসেম্বর , আজ থেকে প্রায় ৫০,০০,০০,০০০ (৫০ কোটি) বছর আগে মাছ এবং আদি-উভচর (amphibians)-রাআবির্ভূত হতে থাকে

Paleozoic যুগ আর Cambrian সময়কাল ১৭ই ডিসেম্বরে শুরু হয় ।
এ ছিলো সেই সময়কাল, যখন জীবনের নানান বৈচিত্র্যে সাগর যেন ফেটে পড়ছিলো; যাতে ছিলো ক্ষুদ্র থেকে অতি বৃহদাকার প্রাণী আর নানান উদ্ভিদ।
প্রথম অমেরুদণ্ডীরাও এই একই দিনে চলে এলো। পরের দিন, ১৮ তারিখে প্ল্যাঙ্কটনরা মহাসাগরে গঠিত হলো, আর ট্রেলোবাইটরা (এক ধরনের আর্থ্রোপোডা) সবচেয়ে প্রাচুর্যময় জীবনের গঠন পেলো।

১৯শে ডিসেম্বরে শুরু হলো মাছেদের যুগ অর্ডোভিসিয়ান। ঠিক এরই কোনো সময়ে প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণীদের আর কঙ্কালের কাঠামো নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রাণীদেরও পৃথিবীতে দেখা যেতে লাগলো। আসতে থাকলো মেরুদণ্ডী প্রাণীরা।






Tiktaalik (টিকটাআলিক মাছ) প্রাণীটি ছিলো এ জীববৈচিত্র্যের প্রথম অগ্রগামী যারা জল ছেড়ে স্থলে উঠে আসার ঝুঁকিটি নিয়েছিলো। নিঃসন্দেহে, এই স্থলে উঠে আসার মাধ্যমেই এটি ভিন গ্রহ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাটি প্রথমবার অর্জন করেছিলো।

২০ ডিসেম্বর , আজ থেকে প্রায় ৪৫,০০,০০,০০০ (৪৫ কোটি) বছর আগে …
উদ্ভিদসকল জমির ওপরে তাদের বিস্তারলাভ করতে শুরু করলো। রসনালীতে পরিপূর্ণ এই উদ্ভিদগুলো তখন পর্যন্ত প্রাথমিক উদ্ভিদদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিকশিত ছিলো।

পরদিন ২১ ডিসেম্বর , প্রায় ৪০,০০,০০,০০০ (৪০ কোটি) বছর আগে …
পোকামাকড়বীজ আসলো আর জন্তুরা উপনিবেশে বাস করা শুরু করলো।

২২ ডিসেম্বর , প্রায় ৩৬,০০,০০,০০০ (৩৬ কোটি) বছর আগে …
উভচরেরা (Amphibians) আর পাখনাওয়ালা পোকারা এলো।

২৩ ডিসেম্বর , প্রায় ৩০,০০,০০,০০০ (৩০ কোটি) বছর আগে …
এ দিনটি স্মরণীয় হয়ে রইলো প্রথম সরীসৃপের আগমনের জন্য।

একেবারে প্রথম ডাইনোসর এলো ডিসেম্বরের ২৪ তারিখে, কিন্তু ক্যালেন্ডারে তাদের আধিপত্য বেশ অল্পক্ষণের জন্যই।

এর ২ দিন পর ২৬ ডিসেম্বর , প্রায় ২০,০০,০০,০০০ (৪০ কোটি) বছর আগে স্তন্যপায়ীরা এলো, এবং প্রথম পাখি এলো ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে প্রায় ১৫,০০,০০,০০০ (১৫ কোটি) বছর আগে

২৮ ডিসেম্বর , প্রায় ১৩,০০,০০,০০০ (১৩ কোটি) বছরআগেপৃথিবীর বুকে ফুটলো প্রথম ফুল ।

আদিম বনভূমি যতোই জন্ম-বৃদ্ধি ও মরে যেতে থাকলো, ততোই এগুলো ভূপৃষ্ঠের নীচে চাপা পড়তে থাকলো, আর এই মৃতদেহের জীবাশ্ম ততোই কয়লায় পরিণত হতে থাকলো। এর ৩০ কোটি বছর পর, আজ আমরা মানুষেরা শক্তি উৎপাদনে ঐসব কয়লার অধিকাংশই পুড়িয়ে ফেলছি আর তার সাথে আমাদের সভ্যতাকে দূষণ আর বিপর্যয়ের বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছি।

৩০শে ডিসেম্বরের সকাল ৬টা ২৪ মিনিট, আজ থেকে প্রায় ৬,৫০,০০,০০০ (সাড়ে ৬ কোটি) বছর আগের কথা …
এক বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত হেনে ডাইনোসরদের জন্য চরম দুর্ভাগ্য বয়ে আনলো। এখন আমরা এই আঘাত হানার স্থানটিকে ক্যারিবিয়ান সাগর বলে থাকি।
১০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে, ডাইনোসরেরা পৃথিবীতে দাপিয়ে রাজত্ব করেছিলো, সেই সময়ে আমাদের পূর্বসূরীরা, ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা, মাটির নীচে ভয়ে জীবন কাটাতো। সেই গ্রহাণুর আঘাত এই ঘটনাচক্রকে পাল্টে দিলো।
একে বলা হয় (ক্রেটাসিয়াস-পেলিওজেইনি) Cretaceous-Paleogene বিলুপ্তি। এতে পৃথিবীর ৫০% প্রাণী বিলুপ্ত হয়। এ গণবিলুপ্তিতে non-avian ডাইনোসররাও মরে গেল।

একটু কল্পনা করা যাক! মনে করো, গ্রহাণুটি পৃথিবীর দিকে আসতে আসতে কোনো এক বস্তুর সাথে মহাকাশে সামান্য ধাক্কা খেলো। ফলস্বরুপ, গ্রহাণুর গতিপথ গেলো পাল্টে। এটি আর পৃথিবীতে আঘাত হানলো না। তাহলে এখনো পৃথিবীতে হয়তো ডাইনোসরেরা রাজত্ব করতো। তাহলে পরবর্তীতে স্তন্যপায়ী ছোটো প্রাণীরা বিবর্তিত হয়ে কোনোদিনই আমাদের পূর্বসূরীদের মতো হতে পারতো না, আর আমরাও আর কখনো আসতাম না। এ হল চরম অনিশ্চয়তার খুব ভালো একটা উদাহরণ। প্রকৃতিতে টিকে যাবার এক সুযোগ। যা আমরা পেয়েছিলাম তখন।


– ৮ : আদ্যিকালের ঠাকুরদার ঠাকুরদা –


মানুষের বিবর্তন

৩০ ডিসেম্বর , প্রায় ৬,৫০,০০,০০০ (৬ কোটি ৫০লক্ষ) বছর আগে …
প্রাইমেট্‌দের (আদিম বনমানুষ – Primates) আবির্ভাব।

৩১ ডিসেম্বর , সকাল ০৬টা ০৫ মিনিট , প্রায় ১,৫০,০০,০০০ (১ কোটি ৫০ লক্ষ) বছর আগে …
এইপদের (প্রাইমেট্‌ পরবর্তি দু-পায়ে চলা বনমানুষ – Apes) আবির্ভাব।

এ দিনেই দুপুর প্রায় ১টা বেজে ৩০মিনিটে Ape আর মানুষদের সম্ভাব্য প্রথম আদি পুর্ব প্রজাতি Proconsul এবং Ramapithecus রা আসতে থাকে।

৩১ ডিসেম্বর , দুপুর ০২টা ২৪মিনিট , প্রায় ১,২৩,০০,০০০ (১ কোটি ২৩ লক্ষ) বছর আগে …
হোমিনিড (মানুষ ও অন্যান্য এপের মধ্যবর্তী পর্যায়, নরবানর বলা যেতে পারে, ছোট মস্তিস্কের দু পেয়ে বনমানুষ -hominids) এর আবির্ভাব হলো।

মহাবিশ্ব ইতোমধ্যেই সাড়ে ১৩শ কোটি বছর পেরিয়েছে। এখনো আমাদের চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। এই ক্যালেন্ডার যেমনটি দেখাচ্ছে, সময়ের এ সুবিশাল মহাসমুদ্রে আমরা মানুষরা বিবর্তিত হয়েছি কেবল মাত্র শেষ ঘণ্টায়, কসমিক ক্যালেন্ডারের শেষ দিনটিতে

১১টা ৫৯মিনিট ৪৬সেকেন্ড

অদ্যাবধি লিপিবদ্ধ হওয়া সকল ইতিহাস আমাদের কসমিক ক্যালেন্ডারের শুধুমাত্র শেষ ১৪ সেকেন্ডে জায়গা করে নেয়, আর তোমার শোনা প্রত্যেক ব্যক্তি বেঁচে ছিলেন এই এখানেরই কোনখানে। সব, সবকিছু, ছিলো যতো রাজা-রাজ্য আর লড়াই, অভিবাসন আর উদ্ভাবন, যুদ্ধ আর প্রেম; ইতিহাসের বইয়ের পাতার সবকিছুই ঘটে এখানে, আমাদের কসমিক ক্যালেন্ডারের এই শেষসেকেন্ডগুলোতে। কিন্তু আমরা যদি এসবের অনুসন্ধান মহাজাগতিক সময়ের সংক্ষিপ্ত মুহুর্তের মধ্যে করতে চাই; তবে এবার আমাদের স্কেলটিকে পরিবর্তন করতে হবে। ক্যালেন্ডারের শেষ দিন ৩১শে ডিসেম্বরকে ঘন্টা, মিনিট আর সেকেন্ডে ভাগ করে ঘেঁটে দেখতে হবে।

এ মহাবিশ্বে আমরা নবীন আগন্তুক। আমাদের গল্প শুরুটা হয় কসমিক ক্যালেন্ডারের শেষ রাতে।

আজ থেকে ৪০ লক্ষ বছর আগে।
স্থলভূমিগুলো এর অনেক আগেই মহাদেশ গঠন করেছে। তবে পরিবর্তন হতেই থাকে। আফ্রিকার অনেকটা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঘন জঙ্গল বাপক আকারে বিস্তৃত ছিলো। তাতেই আদিম এইপ-রা ডালে ডালে ঘুরে বেড়াতো। হঠাৎ এক সময় ধীরে ধীরে আফ্রিকার পূর্বদিকে ৪,০০০ মাইল ব্যাপী এক বিস্তৃত পর্বতমালা জেগে ওঠে, ফলে ঐ পর্বতমালার পশ্চিমে বৃষ্টি কম হতে থাকে। অনাবৃষ্টিতে ধীরে ধীরে সব যেন আরো শুকিয়ে যেতে থাকে। গভীর ঘন অরণ্যের স্থানে এখন শুধুই ঘাসের বন। একে আমরা এখন আফ্রিকার সাভানা অঞ্চল নামে চিনি।



বাধ্য হয়ে এইপ-রা গাছের ডাল ছেড়ে ঘাসের বনে হাঁটতে শুরু করল আর দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল খাদ্যের সন্ধানে। মনে হচ্ছে সব শেষ হতে চলেছে। কিন্তু না। এর যে প্রতিক্রিয়া তা ভাবলেও অবাক হতে হয়। তখন এরা দুপায়ে হাঁটতে শুরু করে। কারণ তাতে ঘাসের ওপর থেকে বহুদূরে দেখবার সুবিধে হত। এমন অভ্যাসের দরুণ তখন থেকে এখন অব্দি মানুষ দুপায়ে হাঁটছে।

এ হচ্ছে New Year’s Eveএর রাত ৯টা ৪৫মিনিট৩৫লক্ষ বছর আগেকার কথা, তোমার-আমার, আমাদের পূর্বসূরীরা, তাদের পদচিহ্ন রেখে চলে গিয়েছে।
আমরা এই সবে দু পায়ে ভর করে দাঁড়াতে শিখেছি এবং আমাদের পূর্বসূরীদের পথকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছি । যখনি আমরা দু পায়ে দাঁড়াতে থাকলাম, আমাদের দৃষ্টি আর জমির দিকে রইলো না। আমরা তখন ওপরে তাকাতে শুরু করলাম বিস্ময়ে; আর মুক্ত হয়ে গেল আমাদের দৃষ্টি।

মানুষের অস্তিত্বের সব থেকে দীর্ঘতম অংশের জন্য ধরে নেয়া যাক গত ৪০,০০০ প্রজন্ম। আমরা তখন ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম , শিকার করা আর খাবার সংগ্রহের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে থাকতাম । যন্ত্রপাতি তৈরি, আগুনকে নিয়ন্ত্রণ করা, জিনিসপত্র বানানো, সব কিছু জায়গা নেয় কসমিক ক্যালেন্ডারের শেষ ঘণ্টাটিতে।



৩১ ডিসেম্বর, রাত ১০ টা ২৪ মিনিট , প্রায় ২৫,০০,০০০ (২৫ লক্ষ)বছর আগে …
এরই কোনো এক সময়ে প্রথম আদিম মানুষ পৃথিবীতে হাঁটতে শুরু করলো ।

আজ থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগের সেই পৃথিবী, দেখতে অনেকটা এখনকার মতোই; একজন তার সন্তানকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাদের পায়ের ছাপ দেখতে আমদেরই মতো। তাদেরকে দেখতে এখনকার মানুষেরই মত লাগছে। এ হচ্ছে Homo Erectus নামের আদিম মানব প্রজাতি। এই প্রথম কোনো প্রানীর পায়ের ছাপ যেন দেখতে আমাদেরই মত লাগছে! অতীত আর ভবিষ্যতের যতো কীর্তি-গাঁথা, সভ্যতা, সফলতা, সব-সবকিছুর শুরুটা যেন এক-পা এক-পা করে এগুচ্ছে। হ্যাঁ, এই প্রথম আমাদের পদচিহ্নকে আমরা চিনতে পারছি।
তারাই প্রথম পাথরের সরঞ্জামাদি ও হাতিয়ারগুলো বানাতে শুরু করলো। তবে মানুষ তখনও বন্য হিংস্র জন্তুর ভয়ে রাত্রি যাপন করতো।

– ৯ : আমরা মানুষ –


৩১ ডিসেম্বর, রাত ১১ টা৪৪ মিনিট , প্রায়,০০,০০০ (৪ লক্ষ)বছর আগে …
১২টা বাজতে ১৬ মিনিট বাকি,
প্রাগৈতিহাসিক মানবগোষ্ঠীর প্রথম কেউ একজন আগুনকে ব্যবহার করতে শিখলো। আর তারপর আমরা বন্যতায় আগুনকে সম্বল করে আঁধারের ভয়কে ধীরে ধীরে জয় করতে থাকলাম।

৩১ ডিসেম্বর, রাত ১১ টা ৫২ মিনিট , প্রায়,০০,০০০ (২ লক্ষ)বছর আগে …
১২টা বাজতে ৮ মিনিট বাকি,
কঙ্কাল ও শারীরিক গঠনের দিক থেকে আধুনিক মানুষের পদযাত্রার সূচনা হল। আমাদেরকে এবার মানুষের মতো দেখতে লাগছে।

৩১ ডিসেম্বর , রাত ১১ টা ৫৫ মিনিট , প্রায় ১,১০,০০০ (১ লক্ষ ১০ হাজার) বছর আগে …
বর্তমানে পৌঁছুতে আছে আর ৫ মিনিট!

আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে শুরু করলো। প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে সমুদ্রের জলস্তর (সমুদ্রপৃষ্ঠ) নামতে থাকে। ফলে আফ্রিকা আর এশিয়ার আরবীয় অঞ্চলের উপকূলের মধ্যকার দূরত্ব কমতে কমতে ৮ মাইলের মধ্যে চলে আসে। এখনকার লোহিত সাগর তখন চওড়ায় এতোটাই কম ছিলো যে কয়েকজন মিলে তা পার করে ওপারে চলে যাওয়া যায়।

অন্য আরেক প্রজাতি যাদের নাম Homo Sapiens (হোমো সেপিয়েন্স), তাদেরই কয়েকজন প্রথম এই সরু জলপথকে অতিক্রম করে আফ্রিকা থেকে ওপারে চলে গেলো। এখনকার বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে এই বিশ্বাসে এক হয়েছেন যে, এই মুষ্টিমেয় মানবগোষ্ঠীই প্রজন্মান্তরে এশিয়া, ইউরোপ, ভারত আর বহু পরে আমেরিকাতে ছড়িয়ে পড়েছে।

৪০,০০০বছর আগে …
মানুষরা যতোই উত্তরে এগোতে থাকে, ততোই বরফের এক বিশাল দেয়াল যেন তাদের দিকে দক্ষিণে জোড় কদমে বিস্তৃত হতে থাকে। এক তুষার যুগের(উইকিপিডিয়া অনুসারে এর স্থায়িত্বকাল ১,১০,০০০ থেকে ১২,০০০ বছর পুর্ব পর্যন্ত) সূচনা হতে চলেছে। বহু আগে আর একবার তুষার যুগ এসেছিলো। তবে এখনকার এই যুগ যেন মানবগোষ্ঠিকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে থাকে। হাজার হাজার বছর অতিকায় বরফের চাঁই পুরু চাদরের মত সারা পৃথিবীকে ঢেকে রাখলো। আর একটা সময় আবার সব গলতে শুরু করল। তখন বরফ গলা সমুদ্রের জল অনেক নিচে ছিলো। আর তাই সাইবেরিয়া ও আলাস্কাতে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটেই যাওয়া যেত। এভাবেই বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে তখনকার মানুষেরা এশিয়া থেকে এক নতুন ভূখণ্ড আমেরিকায় চলে আসে।

আমরা মহাবিশ্বের সময়ের মাপকাঠিতে এতোটাই নবীন যে তখনও আমরা ছবি আঁকা জানতাম না। তবে কসমিক ক্যালেন্ডারের শেষ৬০ সেকেন্ড আসতে না আসতে আমরা এটি শিখে যাবো।

১১টা ৫৯মিনিটে আমরা শিখতে থাকি কিকরে ছবি আঁকতে হয় ।



আমরা চিত্রাঙ্কণের পাশাপাশি পাথর কেটে মূর্তি তৈরি করতে শিখলাম। তখনকার মানুষের আঁকা ছবিগুলো আমরা পৃথিবীর নানান জায়গায় এখন দেখতে পাই। এখন অব্দি পাওয়া সবচেয়ে পুরনো প্রথম গুহাচিত্র (Cave Painting) রয়েছে ইউরোপে। এসব তো নিছক ৩০,০০০ বছর আগেকার কথা।

– ১০ : মানবের কৌতূহল –


এবার আসছে সেই সময় যখন আমরা জ্যোতির্বিদ্যা উদ্ভাবন করলাম। মূলত, আমরা সকলে জ্যোতির্বিদদের ওপরেই নির্ভরশীল ছিলাম। কোন্‌ নক্ষত্র কবে কোথায় উঠবে তা আন্দাজ করে আমরা আগেভাগেই অনুমান করতাম যে, পরের শীত কবে আসবে আর বন্যপশুপাল আবার কবে কোথায় ফিরে আসবে; এসবের ওপরেই আমাদের টিকে থাকা নির্ভর করতো।

তারপর থেকে, এই গত ১০,০০০বছর শুরুরপুর্ব পর্যন্ত আমাদের জীবন-যাপনের পদ্ধতিতে এক বিপ্লবের সূচনা হতে থাকে। তখন থেকে এখন অব্দি আমরা আমাদের জীবনযাত্রাকে উন্নততর করে চলেছি।



৩১ ডিসেম্বর, রাত ১১ টা ৫৯ মিনিট
আমাদের কসমিক ক্যালেন্ডার শেষ হতে কিংবা বর্তমান সময়ে আসতে আর ১ মিনিট অবশিষ্ট!

৩২ সেকেন্ড, আজ থেকে প্রায় ১২,০০০ বছর আগে,
আমাদের এই পূর্বসূরীরা জানতো কি করে তাদের পরিবেশকে সাজিয়ে নিতে হয় । তারা বন্য উদ্ভিদ আর পশুদের লালন পালন করত । তারা জমিতে চাষাবাদ করা শুরু করলো । আর এক স্থানে বসবাস করে নিজেদের দেখাশুনা করতে থাকলো । ধীরে ধীরে আমরা সব কিছুকে পাল্টাতে থাকলাম ।
ইতিহাসে এই প্রথম বারের জন্য, আমাদের নিকট বয়ে নেবার চাইতে অতিরিক্ত কিছু আছে। একটা উপায় দরকার যাতে আমরা এর হিসেব রাখতে পারি।



মধ্যরাতের ১৪ সেকেন্ড বাকি সেই সময়ে, কিংবা প্রায়,০০০বছরআগে, আমরা উদ্ভাবন করলাম – কি করে লিখতে হয়।
আর তারপর সেই সময় আর খুব একটা দূরে নেই যখন আমরা খাবার-দাবারের হিসেব রাখাসহ বা এর বাইরেে আরও বহু কিছু লিপিবদ্ধ করতে শুরু করবো। লিপি-লিখন আমাদেরকে আমাদের কথা-চিন্তা-ভাবনাকে সংরক্ষণ করতে দিলো আর স্থান-কালের বহু বহু দূরে পাঠাবার এক উপায় করে দিলো।

– ১১ : সভ্যতা-অসভ্যতা, উন্নতি –


আমরা ধীরে ধীরে ক্ষমতাধর হয়ে অন্যকে পরাস্ত করার উপায় উদ্ভাবন করতে থাকলাম । পাথর আর মৃত্তিকার শিলাতে লিপি-লিখনের মধ্যমে আমরা আমাদের এসব লিখে রাখলাম ।
আমরা জগৎ কাঁপিয়ে সামনে এগোতে থাকলাম…



৪৭ সেকেন্ড, ৫,৫০০ বছর আগে… বা, মধ্যরাত আসতে ১৩ সেকেন্ড বাকি
তখনকার হস্তলিপির নমুনা আমরা আজ খুঁজে পেলাম যা ছিলো প্রাচীন যুগের সমাপ্তির চিহ্ন এবং ইতিহাসের শুরু , ব্রোঞ্জ যুগের শুরু

৪৮ সেকেন্ড, ৫,০০০ বছর আগে … ১২ সেকেন্ড বাকি
মিশরের প্রথম রাজবংশ, সুমের(Sumer) মধ্যে প্রারম্ভিক রাজবংশীয় কাল, জ্যোতির্বিদ্যা

৪৯ সেকেন্ড, ৪,৫০০ বছর আগে … ১১ সেকেন্ড বাকি
বর্ণমালা, আক্কাদিয়ান(Akkadian) সাম্রাজ্য, চাকা আবিষ্কার

৫১ সেকেন্ড, ৪,০০০ বছর আগে … ৯ সেকেন্ড বাকি
হাম্মুরাবি’র(Hammurabi) শিলালিপি, মিশরের মধ্যযুগীয় সাম্রাজ্য

৫২ সেকেন্ড, ৩,৫০০ বছর আগে … ৮ সেকেন্ড বাকি
মাইসিনিয়ান(Mycenaean) গ্রীস; Olmec সভ্যতা; পূর্বাঞ্চলের দিকে, ভারতে, এবং ইউরোপে এবং লৌহ যুগ(Iron Age); কার্থেজের প্রতিষ্ঠা

৫৩ সেকেন্ড, ৩,০০০ বছর আগে … ৭ সেকেন্ড বাকি
ইসরায়েলে সাম্রাজ্য; প্রাচীন অলিম্পিক গেমস , Moses জন্মালেন

৫৪ সেকেন্ড, ২,৫০০ বছর আগে … ৬ সেকেন্ড বাকি
বৌদ্ধ(গৌতম বুদ্ধ), কনফুসিয়াস, চায়না অঞ্চলের কীণ রাজবংশ, আধুনিক(Classical) গ্রীস, অশোকএর সাম্রাজ্য, বেদ সম্পূর্ণ হয়, ইউক্লিডীয় জ্যামিতি, আর্কিমিডীয় পদার্থবিদ্যা, রোমান প্রজাতন্ত্র

৫৫ সেকেন্ড, ২,০০০ বছর আগে … ৫ সেকেন্ড বাকি
টলেমির জ্যোতির্বিদ্যা, রোমান সাম্রাজ্য, খ্রীষ্ট, সংখ্যা ০(শূন্য) এর আবিষ্কার

৫৬ সেকেন্ড, ১,৫০০ বছর আগে … ৪ সেকেন্ড বাকি
ইসলাম ধর্ম, মায়া সভ্যতা, সং(Song) রাজবংশ, বাইজেন্টাইন (Byzantine) সাম্রাজ্যের উত্থান

৫৮ সেকেন্ড, ১,০০০ বছর আগে … বা, মধ্যরাত আসতে ২ সেকেন্ড বাকি
মঙ্গোল সাম্রাজ্য, চেঙ্গিস খান তার হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, ক্রুসেড( Crusades), ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা অভিযান, ইউরোপে এলো রেনেসাঁ (Renaissance in Europe)।

প্রায়সেকেন্ড আসতে না আসতেই, ভালো খারাপ যাই হোক, পৃথিবীর দুটি অংশ একে অন্যকে আবিষ্কার করলো। ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকা অভিযান করে একে আবিষ্কার করলেন ।

– ১২ : শেষ মুহুর্তের কথা –


শেষ সেকেন্ডে, গত ৫০০ বছরে, আমরা কত কী না করেছি! আধুনিক বিজ্ঞান জাদু দেখিয়েছে, দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, আমরা পৃথিবী ছেড়ে মহাকাশের দিকে রওনা দিয়েছি, চাঁদে পা রেখেছি, মহাকাশযান পাঠিয়েছি সৌরজগতেরও বাইরে। এটা সেই সময়, যখন বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী সব উন্নতি, বৈশ্বিক সংস্কৃতির উত্থান, সাথে সাথে মানবজাতির নিজেদের ধ্বংসের উপায় করে নেয়া—এসব হয়েছে ও হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা সুদূর অতীত ভ্রমণ করে এবার বর্তমানে এসে ঠেকেছি।

পৃথিবীর গল্প তো শেষ হয় নি। এখনো অনেক কিছু বাকি! আমাদের পৃথিবী হয়তো আরো ৪৫০ কোটি বছর টিকে রইবে। আরো বেশি বিস্ময়, অধিক শংকা এবং আরো অধিক অদ্ভুত জীবন-সৃষ্টির লীলাখেলা আমাদের সামনে পড়ে আছে, আমাদেরই এই অবিশ্রান্ত পৃথিবীতে, বয়ে চলা ভবিষ্যতে। আমাদের এই মহাকালের গল্পের পরের অধ্যায়গুলো এখনো লেখা হচ্ছে।

আজ থেকে অনেক অনেক বছর পর মহাজাগতিক পঞ্জিকার এককগুলো পাল্টে যাবে। তখন আর এক সেকেন্ডে হয়তো ৪৩৮ বছর হবেনা। এখন আমরা বলছি, ৫ সেকেন্ড আগে শূন্য সংখ্যাটির আবিষ্কার হয়েছে। কোনো এক সময় পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো বলবে, ৫ সেকেন্ড আগে আমরা নতুন এক গ্রহে কলোনী স্থাপন করেছি। অসীম সম্ভাবনা অপেক্ষা করে আছে আমাদের প্রজাতির জন্য। পরবর্তীতে এই পঞ্জিকায় কী কী লেখা হবে, সেটার নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে আমাদের প্রজাতির ওপরেই নির্ভর করে। আমরা কি যুদ্ধ করে নিজেদেরকে ধ্বংস করে দেবো? নাকি প্রজাতির সকলে মিলে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়বো? সিদ্ধান্ত আমাদের হাতেই।

 

উৎস ঃ https://bigganjatra.org/mohakaler-kotha/